পুঁইছড়িতে অবৈধভাবে কোটি টাকার বালু উত্তোলন, বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ!

মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী: বাঁশখালী উপজেলায় পুঁইছড়ি ছড়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে বালু। পাহাড়ের পাদদেশে এ কাজে জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিশাল সিন্ডিকেট। পাহাড়ের পাদদেশে বেয়ে আসা ছড়া হতে বালু উত্তোলনের ফলে একদিকে যেমন বিনষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে পাহাড় ধ্বসে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বনভূমি। তার সঙ্গে কেটে পাচার করা হচ্ছে গাছপালা। নষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট। পাহাড়ের পাশের ছড়াগুলোর বালু কেটে পাচার করায় এগুলো বর্তমানে নদীর রূপ নিচ্ছে। অজানা কারণে এসব কর্মকান্ডে বাধা না দিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গাছ পাচার, পাহাড় ও ছড়া কাটার ক্ষেত্রে কেউই বিধি-বিধানের তোয়াক্কা করছে না। পাহাড় কেটে ও ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট হচ্ছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ পাহাড় ও সবুজ বনভূমি, বর্তমানে এই বনভূমি চুনতি অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক সবুজ সৌন্দর্য দিন দিন মরভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

BanshkhaliTimes

সরেজমিনে পরির্দশনকালে শনিবার (১৬ এপ্রিল) দেখা যায়, বাঁশখালী প্রধান সড়কের পুঁইছড়ির প্রেমবাজার থেকে পূর্বে তিন কিলোমিটার দূরে জঙ্গল পুঁইছড়ি বালুমহাল। এখন সরকারি বালুমহালের জায়গা বাদ দিয়ে পুঁইছড়ি ছড়ার অন্তত ১৫-২০টি স্পট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজার মেশিন দিয়ে। প্রেমবাজার থেকে পূর্ব দিকে রওনা দিতেই দেখা যায়,  পুরো ৩ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে বিশাল বিশাল বালুর স্তূপ।
এই যেন এক বালুর হাট-বাজার! প্রতি দশ মিনিটের মাথায় একের পর এক বালুভর্তি ট্রাক আসছে আর যাচ্ছে। রাস্তাজুড়ে ধূলো আর ধূলো!

  •  বালু পরিবহনে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ
  • ৩০- ৩৫টি স্পটে কোটি কোটি টাকার বালু মজুদ
  • পূর্ব পুঁইছুড়ির পুরো রাস্তা জুড়ে অবৈধভাবে উত্তোলন কৃত বালুর হাট।

স্থানীয়রা জানান, জঙ্গল পুঁইছড়ি বালুমহালের ইজারা ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে বাতিল করে জেলা প্রশাসন। এর আগে ২০১৯ সালে স্থানীয় ঠিকাদার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন ২২ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় জঙ্গল পুঁইছড়ি বালুমহাল ইজারা নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বালুমহালের ইজারা বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বন্ধ হয়নি বালু উত্তোলন। বরং দিনের পর দিন আরো বেশি করে বালু তুলছেন একটি বালু সিন্ডিকেট। যার ফলে এসব বনভূমি এলাকা থেকে একশ্রেণীর স্থানীয় কতিপয় নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী চক্র সিন্ডিকেট গঠন করে প্রতিযোগিতামূলকভাবে টিলা ও ছড়া কেটে বালু এবং মাটি উত্তোলন করে করছে। সাথে সাথে বনের গাছ ও কেটে সাবাড় করছে ভূমিদস্যুরা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারী অনুমোদনবিহীন অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে রাস্তা-ঘাট ও শত শত বছরের পাহাড়গুলো ধ্বংস হয়ে বনায়নের ব্যাপত ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। যেভাবে টিলা, ছড়া, পাহাড় কেটে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তাতে খুবই বিপর্যয় নেমে আসবে, প্রাকৃতিক পরিবেশ চরমভাবে হুমকির মুখে পড়বে। পুরো এলাকাজুড়ে ভাঙ্গনরোধে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকায় দিন দিন পাহাড়গুলোর ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার ফসলি জমি, জীব-বৈচিত্র্য, ঘর-বাড়ি, বসত ভিটা, রাস্তা-ঘাট, মসজিদ, কবরস্থান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ মূল্যবান জাতীয় সম্পদ বিলীন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় বাড়বে।

BanshkhaliTimes

স্থানীয়রা আরো জানান, প্রতিদিন তারা ১শ থেকে ২শ ট্রাক বালু বিক্রি করেন । ট্রাকযোগে বালুগুলি বিভিন্ন এলাকায় সাপ্লাই দেওয়া হয়। প্রতি ট্রাক বালু ৭০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়। আবার ঘরোয়া ক্রেতারা স্থানভেদে কিনছেন তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়। পাহাড়ি জনপদের পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাস্তার পাশে ২০-৩০ টি স্পটে এখনো মজুদ রয়েছে অন্তত  ১০-১৫ কোটি টাকার বালু। এখানে বালু উত্তোলনের কাজে রয়েছে ১২-১৫ সদস্যের বিশাল একটি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের আড়ালে রয়েছে প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তি। এদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করে অধিক মুনাফার আশায় প্রভাবশালী বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়ছে বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় একটি চক্র। এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে পুঁইছুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা সোলতানুল গনী চৌধুরী (লেদু মিয়া) বলেন, পূর্ব পুঁইছুড়ি এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে একদিকে রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে এলাকার সাধারণ মানুষের বাড়িঘর থেকে শুরু করে ফসলি জমি বিলীন হয়ে পড়ছে। অবৈধভাবে বালু ও মাটি বিক্রয়ের ফলে দিন দিন বিলীন হতে বসেছে পূর্ব পুঁইছড়ি এলাকার অধিকাংশ বসতঘর। অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের ফলে রাস্তা-ঘাট ও শত শত বছরের পাহাড়গুলো ধ্বংস হয়ে বনায়নের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। সাধারণ জনগণের কথা বিবেচনা করে এর প্রতিকার চেয়ে পরিষদের পক্ষ থেকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ করেও বালুর ব্যবসা বন্ধ করতে পারছি না।’

বাঁশখালী  উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাইদুজ্জান চৌধুরী বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হলে সেই যেই কেউ হউক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানের খবর পেলেই বালু কারবারিরা গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়।  তাছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে তাদের বিরুদ্ধে খুব শীগ্রই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে বালুখেকোদের দাপট বন্ধ করা হবে।’

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.