বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী তুহিনের নকশীকন্যা হয়ে উঠার গল্প

বাঁশখালী টাইমস, নভেরা ডেস্ক: ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি যখন চাকরি একটা হয়েই যাবে’ এমন ধ্যান-ধারণা পোষণ করা ব্যক্তির সংখ্যা নেহাত কম নয়। এর মধ্য থেকে যখন কেউ “চাকরির বাজারে না ছুটে চাকরির বাজার গড়বো” প্রত্যয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার মশাল হাতে এগিয়ে আসে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আজ আমরা কথা বলছি হুমাইরা খানম চৌধুরী তুহিনকে নিয়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত সেই শিক্ষার্থী কিভাবে পড়াশোনার পাশাপাশি সফলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছেন, আমরা আজ সে কথা-ই শুনবো।

বাঁশখালী টাইমস তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা ও অনলাইন মার্কেটপ্লেস সৃষ্টির লক্ষে প্রায় ১ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সে ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে বাঁশখালীবাসীর প্রিয় সাপ্তাহিক অনলাইন হাট ‘বাঁশখালী টাইমস ফ্রাইডে মার্কেট’।

এবার সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে আমাদের নতুন আয়োজন ‘নারী উদ্যোক্তার মুখোমুখি’। এ পর্বের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন নভেরা বিভাগের সহ সম্পাদক দিলুয়ারা আক্তার ভাবনা।

নভেরা’র বিভাগীয় সম্পাদক সালসাবিলা নকি’র পরিকল্পনায় এ পর্ব সাজানো হয়েছে বাঁশখালীর মেয়ে সফল নারী উদ্যোক্তা হুমাইরা খানম চৌধুরী তুহিন’কে নিয়ে। তাঁর সম্পর্কে জানা যাক তাঁর নিজের ভাষায়…

🎴 উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার পথচলার শুরুর গল্প (প্রথম মূলধন ও অন্যান্য) ও ব্যবসায়ের ধরণ সম্পর্কে বলুন?

তুহিন: উদ্যোক্তা হিসেবে আমি প্রথমে অনলাইন এর মাধ্যমে জুয়েলারি ক্রয় করে, অনলাইনে নয় অফলাইনে সেল দেওয়া শুরু করি। কিন্তু সেটা বেশি দুর এগুতে পারিনি। কারণ, অনলাইন সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না। প্রথমে ২০০০ টাকা মুলধন নিয়ে আমার উদ্যোক্তা জীবন শুরু করি। আমার চিন্তা ছিল গ্রামের বেকার মহিলাদের কীভাবে কাজে লাগাতে পারি। পরবর্তীতে, এলাকার কিছু বেকার মহিলা নিয়ে নকশিকাঁথার কাজ আরম্ভ করি।

♦️ আপনি কেন স্বাবলম্বী কিংবা বাড়তি আয়ের জন্য এই পেশা বেছে নিলেন; কোন অনুপ্রেরণা কিংবা তাড়না কাজ করছিল কিনা?

তুহিন: আসলে যদি বলি কারও কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পায়নি। বর্তমানে চাকরির বাজার খুব একটা ভালো না। আমরা যদি সারাক্ষণ চাকরির পেছনে দৌঁড়াদৌঁড়ি করি, চাকরি দিবে কে? শিক্ষাজীবন শেষে আমাদের প্রধান লক্ষ্য চাকরির দিকে থাকে, বিধায় দিন দিন বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমার কথা হচ্ছে আমি যে কাজটা পারি সেই কাজটা দিয়ে কাজ শুরু করি। সেই কাজকে ভালবাসি যেই কাজ আরও দশজন করতে পারে। সেই চিন্তা চেতনা থেকে আমার পথচলা শুরু। জবাবদিহিতা নেই নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা যায়। স্বাধীন। তাই আমি স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এই উদ্যোক্তা জীবন বেঁচে নিয়েছি।

♦️ নিশ্চয়ই এ কাজে আপনাকে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, সেসব কি এবং তা কিভাবে মোকাবেলা করেছেন?

তুহিন: প্রথম থেকে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হই, এবং এখনও সেটার সমাধান হয়নি। কিন্তু, সেই বাঁধাকে মোকাবেলা করার যথেষ্ট ধৈর্য আমার আছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করা। কিন্তু পরিবার চায় চাকরির পথটা বেঁচে নিই। দ্বিতীয়ত, আমি কাজ করতেছি বাঁশখালীর প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, এখান থেকে যাতায়াত ও কুরিয়ার খরচ অনেক বেশি। যার ফলে, আমার পণ্য কালেকশন ও ডেলিভারি দিতে খুব কষ্ট করতে হয়।

♦️ শুরুর পর থেকে বর্তমানে আপনার ব্যবসা কোন অবস্থানে রয়েছে। ( এ পর্যন্ত কত টাকার বিক্রি/ দৈনিক/ মাসিক বিক্রির পরিমাণ) কতটুকু সফল মনে করেন নিজেকে?

তুহিন: আলহামদুলিল্লাহ! আগের অবস্থান থেকে এখন খুব ভালোই আছি। আমার ব্যবসা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিক্রির পরিমাণ ৩ লাখ এর কাছাকাছি। দৈনিক বিক্রির পরিমানটা এমন অনেক সময় পাঁচ হাজারের উপর হয়, অনেক সময় তা হয় না। আশা রাখি, একসময় এটা অনেক বৃদ্ধি পাবে। আমি সফল সেটা আমি বলবো না। কিন্তু, সফলতার পথে হাঁটছি।

♦️ আপনি কোন ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করছেন? পণ্য অর্ডার, ডেলিভারি প্রসেস ও হ্যান্ডওভার সাধারণত কিভাবে করে থাকেন?

তুহিন: আমি শুরু থেকে নকশিকাঁথা নিয়ে কাজ করতাম। এখন ঈদকে সামনে রেখে নকশি বেডশিট, বেবিকাঁথা, ন্যাপি, নিমা, থ্রি পিচ, শাড়ি ও পাঞ্জাবি কালেকশন যোগ করেছি।
টাইমলাইন, আমার ‘অতিথি কালেশন” পেইজ, ওখান থেকেই প্রচারণার মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া হয়। আমার এরিয়ার মধ্যে হলে হ্যান্ডওভার ডেলিভারি দিই। আর যদি দূরে হয় কুরিয়ার এর মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে দিই।

♦️ আপনার ব্যবসায়ের প্রচার প্রচারণার ক্ষেত্র ও কৌশল নিয়ে যদি বলতেন। এক্ষেত্রে কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলে তা শেয়ার করুন।

তুহিন: আমার ব্যবসাটা মূলত অনলাইন রিলেটেড। আমার নিজের আইডি, আমার ব্যবসায়ী পেইজ ‘অতিথি কালেকশন’ ও বিভিন্ন বিজনেস গ্রুপের মধ্যে পণ্যের গুনগত মান নিয়ে ক্রেতাদের জানান ও বিভিন্ন গল্প দিয়ে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করি।

♦️ ব্যবসা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য কী?

তুহিন: ব্যবসার সাথে যখন জড়িত আছি অবশ্যই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। আমার ইচ্ছে আমাদের দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করার। গ্রামে যেসব অসচ্ছল ও বেকার মহিলা আছে ওদের নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান করার।

♦️ উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কোনটি?

তুহিন: উদ্যোক্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে বড় অনুপ্রেরণা আমার মা। যাকে দেখে আমি সব সময় ভাবি নিজেকে নিয়ে কিছু একটা করার। কীভাবে একটা মেয়ে ঝড়, তুফান উপক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তার অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছেন আমার মা। সুতরাং, মা হচ্ছে আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

♦️ পড়াশোনার পাশাপাশি কিভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করছেন?কোনরকম সমস্যার হয় কি না?

তুহিন: হুম, পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা করা তো কষ্ট হবেই। যেহেতু, ব্যবসাটা মূলত অনালাইনকেন্দ্রিক সেই হিসাবে সবসময় অনলাইনের প্রতি একটা নজর রাখতে হয়। আমার ব্যবসায়টা মূলত নকশিকাঁথা নিয়ে তাই আর্ট গুলো আমার নিজেরই করতে হয়। আমার সাথে যারা কাজ করে তারা কেউ পারে না। সবকিছু মিলিয়ে যখন কাষ্টমারের সুন্দর আচরণ, সঠিক সময়ে ঠিকঠাক মতো কাষ্টমারের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, তখন কষ্টটা আর কষ্ট লাগে না।

♦️ বাঁশখালী টাইমস ফ্রাইডে মার্কেট নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও পরামর্শ শেয়ার করুন-

তুহিন: প্রথমে বাঁশখালী টাইমস এর সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক, এডমিন, মডারেটর ও সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ। আমরা যারা ক্ষুদ্র অনলাইন ব্যবসার সাথে জড়িত আছি ওদেরকে সপ্তাহে একদিন বেচা-কেনার প্লাটফর্ম তৈরি করে দেওয়ায়।
বাঁশখালী টাইমস ফ্রাইডে মার্কেট এ আমার প্রথম কাস্টমার ছিল সাধনপুরের এক ভাইয়া। উনার ক্রয় থেকে শুরু করে পেমেন্ট পর্যন্ত আমাকে এতটা মুগ্ধ করে ছিল যা সত্যি ভুলার মতো নয়। সত্যি বলতে, ফ্রাইডে মার্কেটে এতটা সাড়া পাব আমি কল্পনাও করিনি। বাঁশখালী টাইমস ফ্রাইডে মার্কেটের যে কার্যক্রম বহমান আছে, সেগুলো যাতে আগামীতে আরও সুন্দরভাবে চলমান থাকে এটাই আমার প্রত্যাশা।

বাঁশখালী টাইমস: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাদের সময় দেয়ায়।

তুহিন: আপনাকে ও বাঁশখালী টাইমসকেও ধন্যবাদ; আমার মতো একজন সাধারণ উদ্যোক্তাকে নিয়ে সাক্ষাৎকারের পর্ব সাজানোর জন্য।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.