‘এমপির ইন্ধনে ধর্ষণ মামলা’ সংবাদ সম্মেলনে পৌরমেয়রের অভিযোগ

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর ইন্দনে ‘কথিত’ ধর্ষণ চেষ্টার মামলা হয়েছে। যেটি পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। যেখানে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও রক্ষা পাইনি।’

শনিবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে নগরের চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাঁশখালী পৌরসভার মেয়র ও পৌরসভা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালের ১৭ থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহব্যাপী বাঁশখালী মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে সদস্য সচিব হিসেবে বিজয় মেলার আয়োজন করি। প্রথমদিন প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয় মেলার উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে একেকদিন একেকজনকে অতিথি করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের অতিথি করায় ক্ষিপ্ত হন এ সংসদ সদস্য।’

শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি কোন গ্রুপিং রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া শেখ হাসিনার কর্মী। এ কথা শোনার পর থেকে আমাকে নিজের প্রতিপক্ষ বানিয়ে নানাভাবে বিরোধ বাড়াতে থাকে। এমনকি সরকারের চতুর্থ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটান ও পৌরসভার উন্নয়ন নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাকে হেয় করে বক্তব্য দেন এ সংসদ সদস্য। আওয়ামী লীগের একজন দলীয় এমপি হয়ে দলীয় মেয়রের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোয় আমাকে ব্যথিত করে। পরে আমি পৌরসভা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আলাপ করে পৌরবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বিবৃতি প্রদান করি। সেখানে আমি বলি, উন্নয়নের কথা না বলে আমাকে কোন প্রমাণাদি ছাড়া ‘চোর’ সম্বোধন করায় আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। কারণ, আমি একজন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত পৌরমেয়র।’

এছাড়াও গত ১৭ মার্চ আমি শহর থেকে পৌরসভার উদ্দেশ্যে ফেরার পথে কালীপুর ইউনিয়ন এলাকায় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর চাচা সরলের ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ চৌধুরী (উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি) নেতৃত্বে দুইজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক আমার গাড়িতে হামলা চালায়। এসময় গাড়ির পেছনের দুটি লাইট ভেঙে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতা দিবসে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে আমি পৌরমেয়র ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হই। সেই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য প্রধান অতিথি ছিলেন। আমি মঞ্চে বসাবস্থায় এমপি সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে আমাকে দেখেই হিংসাত্মক আচরণ করতে থাকেন। ক্ষিপ্ত হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সংসদ সদস্যের ইশারায় কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক মঞ্চের পেছন থেকে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষুব্ধ হন এবং অনুষ্ঠান বর্জন করার চেষ্টা চালান। পরে আমি নিজেই হস্তক্ষেপ করে দলের স্বার্থ বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের শান্ত করি। গাড়িতে হামলা ও মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা সভায় গালিগালাজের ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে আমি বাঁশখালী থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করি।’

সংসদ সদস্য প্রতিনিয়ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসাদচরণ করেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্য আমাকে পৌরবাসীর কাছে হেয় করতে উঠেপড়ে লাগেন। এর পেক্ষিতে গত ৩ জুন আমার বিরুদ্ধে একজন খারাপ ও দুশ্চরিত্রবান মহিলাকে বাদি করে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ চেষ্টার মামলা দায়ের করেন। অথচ মামলায় ঘটনার যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে (২৮ মার্চ) সেদিন ছিল ১২ রমজান। আমি সেদিন ঢাকার নিউ ইস্কাটনে আমার বাসার পাশে নুর জামে মসজিদে খতম তারাবি পড়ি। যার প্রমাণ আমার হাতে আছে। আরও অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে আমি যখন পরিবার নিয়ে আমেরিকা যাই তখনি আমার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমি আমেরিকা থাকাকালীন সময়ে যাতে আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যাকে মামলার বাদি করা হয়েছে তার নানার বাড়ি সংসদ সদস্যের বাড়ির কাছে এবং মামলায় যাদেরকে স্বাক্ষী করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই এমপির বাড়ি জালিয়াঘাটার বাসিন্দা। কথা হলো, ঘটনা পৌরসভা এলাকায় হলেও ঘটনার দিন জালিয়াঘাটার মানুষ সেখানে কিভাবে গেলো? এখানেই প্রমাণিত হয় মামলাটি মিথ্যা ও এমপির ইন্ধন রয়েছে। মেয়েটি ও তার পরিবারের সদস্যরা আগেও বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে এরকম মামলা করছে বলেও অভিযোগ করে পৌরমেয়র শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী।

হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে উল্লেখ করে পৌর মেয়র আরও বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬৬ বছর। সন্তানরা বড় হয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। পাক বাহিনীর হাত থেকে মা-বোনের ইজ্জত বাঁচিয়েছি। অথচ জীবনের শেষ সময়ে এসে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট, সাজানো একটি ধর্ষণ মামলা করা হয়েছে। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এরপরেও মামলাটি যখন তদন্তাধীন আছে বিশ্বাস করি সত্য অবশ্যই প্রকাশ হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বাঁশখালীর বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম, টিআর/কাবিখা লুটপাট, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরি নিয়োগ বাণিজ্য, স্কুল ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে খারাপ আচরণ ও মারধর, সাংবাদিককে হুমকিসহ সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্দেশ্যে নানান অভিযোগের কথা তুলে ধরেন পৌরমেয়র শেখ সেলিমুল হক চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে বাঁশখালী পৌরসভার প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন, কাউন্সিলর দিলীপ চক্রবর্তী, কাউন্সিলর নজরুল কবির, প্যানেল মেয়র (৩) মো. হারুণ, কাউন্সিলর জমশেদ আলম, কাউন্সিলর বাবলা কুমার দাশ, মহিলা কাউন্সিলর রুজিনা আক্তার, রুজিয়া সুলতানা, নার্গিস আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ২৮ মার্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর আদালতে বাঁশখালীর পৌরসভার শেখ সেলিমুল হক চৌধুরীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন এক কলেজছাত্রী।

সূত্র: বাংলা নিউজ

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.