আলোকিত সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা ‘ মাস্টার নজির আহমদ ‘

আলোকিত সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা ‘ মাস্টার নজির আহমদ ‘

মাস্টার নজির আহমদ ১৯২৭ সালে দক্ষিণ বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের নাপোড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তখনকার সময়ে শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে ছিল মুসলিম সমাজ। বাঁশখালীও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তৎকালীন সময়ে মাস্টার নজির আহমদ মেট্রিকুলেশন পরীক্ষার পর শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। দক্ষিণ নাপোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। পরবর্তীতে তিনি বাড়ির নিকটস্থ জঙ্গল নাপোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলী হন। পুরো কর্মজীবন শিক্ষকতা পেশায় ব্যয় করে ১৯৯৫ সালে তিনি জঙ্গল নাপোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

মাস্টার নজির আহমদ শিক্ষকতাকালীন সময়ে আর্থিক টানাপোড়নের সম্মুখীন হলেও ৭ পুত্র ও ৩ কন্যাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। তিনি আজীবন স্বপ্ন দেখতেন একটি আদর্শ, শিক্ষিত, আলোকিত সমাজ গড়ার। সেই লক্ষ্যে তিনি দক্ষিণ বাঁশখালীর নিজ এলাকায় ২০০৭ সালে মাস্টার নজির আহমদ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। এছাড়াও তিনি ২০১২ সালে আম্বিয়া খাতুন এতিম ও হেফজখানা, ২০১৪ সালে মাস্টার নজির আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়াও মাস্টার নজির আহমদ বাঁশখালীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করেন। এককথায় বলতে গেলে- বাঁশখালীর শিক্ষার মান উন্নয়নে মাস্টার নজির আহমদের অবদান অনস্বীকার্য।

মাস্টার নজির আহমদ ছিলেন শান্ত স্বভাবের একজন সদালাপী মানুষ। তিনি সবসময় মিশে থাকতেন সাধারণ মানুষের সাথে। চেষ্টা করতেন অসহায়দের পাশে দাড়াতে। দৃঢ়তার সাথে মেনে চলতেন ইসলামী অনুশাসন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও তিনি ছিলেন সহিষ্ণু, সহানুভূতিশীল। ছুটে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেন তাদের বিপদাপদেও। তাই এলাকার সর্বস্তরের মানুষের নিকট মাস্টার নজির আহমদ ছিলেন শ্রদ্ধার স্তম্ভ। শুধু তিনিই এমন ছিলেন না। ছেলেদেরও গড়ে তুলেছেন সেভাবে। সমাজে ছেলেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন ভালো মানুষ হিসেবে। তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছেলেরা আজ পিছিয়ে পড়া বাঁশখালীকে তুলে ধরছেন জাতীয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তাঁর সন্তান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্টান আজ অবদান রাখছে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভে। যেখানে সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান। মাস্টার নজির আহমদ পরিবারই হয়ে ওঠে অনেক মানুষের জীবিকা নির্বাহের ওসিলা। মাস্টার নজির আহমদ পরিবার মানবতার সেবায় নিয়োজিত থাকতে গঠন করেছেন- ‘মাস্টার নজির আহমদ ট্রাস্ট’। যেই ট্রাস্টের উদ্যোগে অসহায়দের সহায়তা প্রদান, রমযানে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, গৃহহারাদের পুনর্বাসন, ঈদ সামগ্রী বিতরণসহ নানান সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। এটা আমাদের বাঁশখালীবাসীর জন্য গর্বের।

মাস্টার নজির আহমদ শিক্ষাসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিকবার স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর দুই পুত্র যথাক্রমে মোস্তাফিজুর রহমান ও মুজিবুর রহমান “সিআইপি” পদক লাভ করেছেন একাধিকবার। এছাড়াও তাঁরা আরো বহু সম্মানজনক পদকে ভূষিত হয়েছেন। সম্প্রতি মোস্তাফিজুর রহমান সিআইপি লাভ করেছেন ‘রাষ্ট্রপতি শিল্প উন্নয়ন পুরস্কার- ২০১৮’। মাস্টার নজির আহমদ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক পূর্বদেশ। যেটি দ্রুত সময়ে ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা লাভ করে। পত্রিকাটি চট্টলবাসীর কন্ঠের সাথে কন্ঠ মেলানোর সক্ষমতা অর্জন করে অল্প সময়ে। দৈনিক পূর্বদেশে নিয়মিত ওঠে আসছে চট্টলবাসীর নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ, সমস্যা, সম্ভাবনার কথা।

মাস্টার নজির আহমদ ২০১৪ সালের ২৭ শে জুন ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর দুইদিন পর তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয় নিজের প্রতিষ্ঠিত মাস্টার নজির আহমদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ময়দানে। সেদিন সেখানে মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। সকাল থেকেই প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে নাপোড়ায় সমবেত হয় সর্বস্তরের মানুষ। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে কুলি-মজুর সবাই শরীক হয় জানাযার নামাজে। । মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাই- তিনি যেন এই মহান মানুষকে ভালো কাজগুলোর বিনিময়ে জান্নাতুল ফিরদাউসে আসীন করেন।

লেখক: মুহাম্মদ তাফহীমুল ইসলাম, তরুণ লেখক

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.