মিশর : মদ যেখানে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার হতো!

রাণী ক্লিওপেট্রাকে না চিনলেও লিভারপুলের খেলোয়ার সালাহকে সবাই চেনার কথা। দুজনেরই দেশ মিশর।

১০ লক্ষ ১ হাজার ৪৫০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের(৩০ তম) দেশ মিশরের জনসংখ্যা দশ কোটির কাছাকাছি। এটি আয়তনে নিউ মেক্সিকোর চেয়ে সামান্য বড়।

শিকারি এবং মৎসজীবিরা নীলনদের তীরে প্রায় ৮ হাজার বছর আগে প্রথম বসতি গড়ে। তারা শস্য ফলাতে ও পশু পালন করতে জানত। নীল নদের তীরে প্রথম তারা গ্রামও শহর গড়ে তুলে। প্রতিবেশী এলাকার সাথে তারা বাণিজ্য শুরু করে এবং পালতোলা নৌকা বানায়।

খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০ সালে সেখানে সভ্যতা স্থাপিত হয়। নীল নদের তীরে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ সালে মিশরীয় সভ্যতার প্রথম সামাজ্যর উদ্ভব ঘটে।

মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার লিপি বা অক্ষর আবিষ্কার। মিশরীয়রা ছাড়াও লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করে সুমেরীয়, চাইনিজ ও মায়ানরা। নগর সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মিশরীয় লিখনপদ্ধতির উদ্ভব ঘটে।

পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তারা সর্বপ্রথম ২৪টি ব্যঞ্জনবর্ণের বর্ণমালা আবিষ্কার করে।

শুরুতে তারা ছবির সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করত। এটার নাম ছিল চিত্রলিপি। যাকে বলা হতো ‘হায়ারেগ্লিফিক’ বা পবিত্র অক্ষর।

পরে তারা নাল খাগড়া জাতীয় গাছের খণ্ড থেকে কাগজ বানাতে শেখে। সেই কাগজের উপর তারা লিখত। গ্রিকরা এই কাগজের নাম দেয় প্যাপিরাস। যে শব্দ থেকে ইংরেজিতে পেপার শব্দের উৎপত্তি।

প্রাচীন মিশরে বাড়ির মেয়ে ও স্ত্রীর ঋতুচক্রের সময় পুরুষ তাদের যত্ন নিত।মিশরের নারীরা সম্পত্তি কেনাবেচা, বিচারে দায়িত্ব পালন করতে পারত। সে কালে মিশরে ভাই-বোন বিয়ে প্রচলিত ছিল। মিশরের একজন মহিলা ৪৩ বছর পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেন মেয়েকে বড় করার জন্যে।

তখন থেকেই আলগা চুল পরার প্রচলন শুরু হয়। গর্ভাবস্তার কথা তারা ৭০ শতাংশ নির্ভুলভাবে জানাতে পারতো। মহিলাদের কিছু বীজে প্রস্রাব করতে বলা হতো। সেই বীজ থেকে গাছ জন্মালে ধরে নেয়া হতো সে গর্ভবতী।

মিশরীয় সভ্যতা ছিল কৃষিনির্ভর ফলে নীল নদের প্লাবন, নব্যতা, পানিপ্রবাহের মাপ জোয়ারভাটা ইত্যাদি ছাড়াও জমির মাপ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

এর ফলে তারা জ্যোতিষশাস্ত্র ও অঙ্ক শাস্ত্র আয়ত্ত্ব করেছিল। তারা অংক শাস্ত্রের দুটি শাখা জ্যামিতি এবং পাটিগণিতেরও প্রচলন করে।

তারা যোগ, বিয়োগ ও ভাগের ব্যবহার জানত। খ্রীষ্টপূর্ব ৪২০০ সালে প্রথম সৌর পঞ্জিকা আবিষ্কার করে তারা।

৩৬৫ দিনে বছর এ হিসাবের আবিষ্কারকও তারা। বার মাসের ব্যবহার শুরু করে প্রতিটা মাস ৩০ দিন ধরে। ৫ দিন রেখেছিল ছুটির দিন হিসেবে। সে হিসেবে বছর শেষ হতো ৩৬৫ দিন্।

সময় নির্ধারণের জন্য সূর্য ঘড়ি, ছায়াঘড়ি, জলঘড়ি আবিষ্কার করে। কলম, তালা ও টুথপেস্টও তাদের আবিষ্কার।

চোখ, দাঁত, পেটের রোগ নির্ণয় করতে জানত। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করার বিদ্যাও তাদের জানা ছিল। তারা হাড় জোড়া লাগানো, হৃৎপিণ্ডের গতি এবং নাড়ির স্পন্দন নির্ণয় করতে পারত।

মদ এক সময় জাতীয় মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই যুগের সমাধিতে টয়লেটের সন্ধান পাওয়া গেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জামা পাওয়া গেছে মিশরে যেটি প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরোনো। তখন তারা পাথরের তৈরি বালিশে ঘুমাত।

বিয়ের রিং বিনিময়ের প্রথা শুরু করেছিল তারা।

eracleion শহরটি ১২০০ বছর পর সমুদ্রের নিচে আবিষ্কার করা হয়।

কোন বিড়াল হত্যা করা হলে হোক সেটা ভুলক্রমে ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো।

২২০০ বছর আগে Eratosthenes পৃথিবীর পরিধি অনুমান করেছিলেন মিশর থেকেই। তার এই পরিমাপ উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভুল ছিল। পরবর্তীতে Christopher Columbus তার ব্যাপারে পড়াশোনা করেন।

অধিকাংশ মিশরীয় সম্রাটদের অতিরিক্ত ওজন ছিল।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কৃত্রিম অঙ্গ(কাঠের আঙুল) ব্যবহার করেন মিশরের একজন মহিলা। অভিজাত মিশরীয় চুলের ভাঁজ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচতে মাথা নয় ঘাড় ঠেকিয়ে ঘুমাত।

অনেকেরই রাতে বিছানো ভেজানোর অভ্যেস আছে। সেটার সমাধান হিসেবে মিশরীয় কৃষকরা ইঁদুরের হাড়কে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করত।

কোন কুকর মারা গেলে সেটাকে সম্মান জানানোর অংশ হিসেবে তখন চোখের ভ্রু কেটে ফেলত তারা।

বিষ্ঠা দেখে মানুষের ভাগ্য বলে দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল।

ল্যুভর মিউজিয়ামের সামনে গ্লাসের যে পিরামিডটি আছে সেটি মিশরের পিরামিডের সম্মানে তৈরি করা।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো মৃত্যু পরোয়ানা দেয়া হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে। এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জাদু বিদ্য চর্চার অভিযোগে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।

তারা মনে করত ঘরে কুকর রাখা পবিত্রতা এবং এতে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়।

তখন মহিলা ও পুরুষ উভয়ই রুপচর্চার প্রসাধনী ব্যবহার করত লেদ, কপার দিয়ে মেকআপ তৈরি করত।

স্টাচু অফ লিবার্টি প্রথমে মিশরের জন্যেই তৈরি করার কথা ছিল পরে সরকারের সমর্থন না পাওয়াতে সেটা চলে যায় আমেরিকায়।

প্রচলিত আছে পিরামিড দাস দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল কিন্তু আধুনিক গবেষকরা জানিয়েছেন পিরামিড কোন দাস দ্বারা নির্মাণ করা হয়নি। নিয়মিত শ্রমিকরাই কাজ করেছিল।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড মিশরে নয় মেক্সিকোতে। মিসরের গাজা পিরামিডে অসংখ্যা গোপন সুড়ঙ্গ পথ আছে যেগুলো এখনো পাওয়া যয়নি।

মিসর পিরামিডের জন্যে পরিচিত হলেও মিসরের চেয়ে বেশি পিরামিড আছে সুদানে। সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে প্রাচীন গির্জার খুফুর পিরামিড পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তমাশ্চর্যের একটি।

এ পর্যন্ত মিশরে ১৩০ টি পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে। Pyramid of Khufu at Giza সবচেয়ে বড় পিরামিড এবং এটি ১৬টি Empire State building এর সমান।

তারা Mercury, Venus, Saturn, Mars, and Jupiter এই গ্রহগুলো নাম জানত তারা বলত Set , (Mercury), “god of the morning” (Venus), “bull of the sky” (Saturn), “Horus the red” or “Horus of the horizon” (Mars), and “Horus who limits the Two Lands” (Jupiter).

মিশরীয়রা জড়বস্তুর পূজা করত, মূর্তি পূজা করত, আবার জীবজন্তুর পূজাও করত। মিশরীয়দের ধারণা ছিল, সূর্যদেবতা ‘রে’ বা ‘আমন রে’ এবং প্রাকৃতিক শক্তি, শস্য নীলনদের দেবতা ওসিরিস মিলিতভাবে সমগ্র পৃথিবী পরিচালিত করেন।

তারা সমাধি আর মন্দিরের দেয়াল সাজাতে গিয়ে চিত্রশিল্পের সূচনা করে। তাদের প্রিয় রং ছিল সাদা-কালো।

মিসরকে এক সময় বলা হত মধ্যপ্রাচ্যের হলিউড। বর্তমানে সিনেমাতে কোন রোমান্টিক দৃশ্যধারণে অলিখিত বাধা রয়েছে।

মিশরের রাজধানী কায়রোকে বলা হচ্ছে মেয়েদের জন্য ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ শহর।

২০১৫ এর আগে মিশরের সব প্রেসিডেন্ট হয় অফিসে থাকাকালে মৃত্যুবরণ করেছেন নয়ত আটক হয়েছেন। আরব দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র মিশরেই ফিল্ম ইন্ড্রাস্টি আছে।

প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বার করত ঈশ্বরের কান্নার কারণে নীল নদ প্লাবিত হয় ফলে বন্যা হয়। এ উপলক্ষ্যে Night of the Tear Drop নামে একটি অনুষ্ঠান পালন করত তারা। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রায় ১৪,৩০০ দেব-দেবীর পুজা করত।

নীল নদ নিয়ে রসিকতার করায় শিরিন আবদেল ওয়াহাব নামে আরব বিশ্বে পরিচিত একজন তারকা শিল্পীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে কয়েক মাস আগে।

মিশরের নীল নদের উৎপত্তি আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া থেকে। সেখান থেকে নদটি নানা দেশ হয়ে মিশরের মধ্য দিয়ে ভূ-মধ্যসাগরে এসে পড়েছে।

প্রাচীন মিশরের ভাষায় এর নাম ছিল “কমেট” (km.t) বা কালো মাটির দেশ। নীল নদের বন্যার সাথে বয়ে আনা উর্বর কালো মাটি যা মরুভূমির মাটি “deshret” (dšṛt) অথবা “লাল জমি” থেকে আলাদা।

ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস বলেছেন, মিশর নীল নদের দান। নীল নদ না থাকলে মিশর মরুভূমিতে পরিণত হতো। প্রাচীনকালে প্রতিবছর নীল নদে বন্যা হতো।বন্যার পর পানি সরে গেলে দুই তীরে পলিমাটি পড়ে জমি উর্বর হয়ে যেত। জমে থাকা পলিমাটিতে জন্মাতো নানা ধরনের ফসল।

নীল নদ পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ নদীগুলোর একটি। নীল নদের আয়তন ৬৬৭০ কিলোমিটার।

মিশর উত্তর আফ্রিকার একটি প্রাচীন রাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই দেশ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। এর উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে লোহিত সাগর, পশ্চিমে সাহারা মরুভূমি, দক্ষিণে সুদান ও অন্যান্য আফ্রিকার দেশ। গাজা, সুদান ও লিবিয়া এবং ইসরাইলের সাথে সীমান্ত আছে।

মিশর ও সুদানের সীমান্তে ২০৬০ কিলোমিটার ভূমি আছে আছে যেটা কেউই দাবি করে না।

সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে।

মিশরের ৯৩ শতাংশ এলাকা মরুভুমি।

মিশর আরবি শব্দ, যার মানে সরকার ও আইন-কানুন বিশিষ্ট রাষ্ট্র। পবিত্র কুরআন ইজিপ্টকে মিশর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মধ্যপ্রাচের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ এবং আরব জনসংখ্যায় মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় দেশ।

আরবি ভাষা মিশরের সরকারি ভাষা। মিশরের জনগণেরর অধিকাংশই আরবি ভাষাতে কথা বলে। মিশরে আরবি ভাষার বেশ কিছু স্থানীয় কথ্য উপভাষা প্রচলিত। মিশরের জিপসি সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধেক লোক জিপসি দোমারি ভাষাতে কথা বলেন। এছাড়াও এখানে আর্মেনীয় ভাষা, গ্রিক ভাষা এবং নীল নুবীয় ভাষা প্রচলিত। কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে সীমিত পরিমাণে কপ্টীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়।

কায়রো দেশের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। কায়রো আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটি।

মাথাপিছু আয় ১১, ১১০ মার্কিন ডলার। । Egyptian pound (EGP) হলো মুদ্রার নাম। মিশরে ইউনেস্কো ঘোষিত সাতটি বিশ্ব ঐতিহ্য রয়েছে। প্রান্তর ঈগল মিশরের জাতীয় প্রাণী।

লেখক: রবি হোসাইন, তরুণ লেখক

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.