শঙ্খনদীর গৌরব গাঁথা || কমরুদ্দিন আহমদ

শঙ্খনদীর গৌরব গাঁথা
কমরুদ্দিন আহমদ

বান্দরবান জেলার থানচির ওপরে রেমাক্রি জল-প্রপাতের আরো উজানে পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে উৎপন্ন শঙ্খনদী। ইংরেজেরা এর নাম দিয়েছে ‘সাঙ্গু’। স্থানীয়রা একে ‘শঙ্খ নদী’ হিসেবেই চিনে থাকে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে ‘শঙ্খ’ একটি বিশিষ্ট নদী। তার প্রথম বিশিষ্টতার মূলে আছে উৎপত্তি ও বঙ্গোপসাগরে মিলিত হবার প্রেক্ষাপট। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলিসহ বাংলা দেশের বেশির ভাগ নদীর উৎস ভারত। বান্দরবানের ওপর দিয়ে তিনটি নদী প্রবাহমান। এর মধ্যে ‘মাতামহুরির’ উৎপত্তি ভারতে। ‘নাফ’ নদীর উৎপত্তি মায়ানমারে, আর শঙ্খের উৎপত্তি বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের নদীকুলের একমাত্র শঙ্খনদী সগৌরবে নিজস্ব ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে উৎপন্ন হয়ে বাঁশখালী উপজেলার খানখানবাদ সমুদ্র সৈকতের অদূরের মাটি এবং আনোয়ারা উপজেলা গহিরার বুকে আস্ত একটি চুম্বন দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চির অভিসারে মগ্ন রয়েছে।
থানচির গহীন অরণ্য ভেদ করে রেমাক্রি জলপ্রপাতে শক্তি সঞ্চয় করে চপলা চঞ্চলা শঙ্খনদী এঁকে বেকে, পাহাড়ি নৃত্যের তালে তালে, কোমর দুলিয়ে তার স্বচ্ছ জলরাশির মিষ্টি স্বাদ বুকে ধারণ করে লামা, আলী কদম, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী উপজেলাকে পরম আদরে পরশ বুলিয়ে বঙ্গোপসাগরে চির অভিসার রচনা করেছে।
শঙ্খনদীর অববাহিকার মানুষ এ নদীকে ঘিরে নানা স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এ নদীকে কেন্দ্র করে ধীবররা বংশপরম্পরায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।

বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের ঢেউ শঙ্খের প্রথম সেতু ‘দোহাজারী সেতু’ পেরিয়ে সাতকানিয়ার বাজালিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে দেখা যায়। বান্দরবন শহর থেকে রাঙামাটির পথের যে ব্রিজটি নির্মিত হয়েছে তা শঙ্খের দ্বিতীয় সেতু, আর চাঁদপুর-তৈলার দ্বীপ পয়েন্টে নির্মিত সেতুটি তৃতীয় এবং বান্দরবান শহরের পূর্ব দিকে শঙ্খের উপর নির্মিত। শঙ্খের মূল ধারার সাথে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ি ঝর্নার ধারা সংযুক্ত হয়েছে। এরা শঙ্খের মূল ধারাকে শক্তি যুগিয়ে আসছে। শঙ্খনদীর তীরে গড়ে ওঠেছে বান্দরবান শহরসহ বহু হাটবাজার, ঘাট।
শঙ্খনদীর বান্দরবান এলাকায় বঙ্গোপসাগরের জোয়ার পৌঁছে না। ওখানে নেই এ নদীর জোয়ার ভাটা। বান্দরবানে জনসাধারণ ও জেলেরা শঙ্খে ধরে মিঠাপানির মৎস্য প্রজাতি। এ নদীর ৫০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের জোয়ার আসে। ওখানে ইলিশসহ নানা রকম সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। দেশের মৎস্য চাহিদা পূরণে এই শঙ্খনদী একটা বিরাট অবদান রেখে চলেছে।
থানচি থেকে খানখানাবাদ সমুদ্র মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরত্বের এ নদীর পাদদেশে নানা প্রকার শাক-সবজির, রবিশস্য, তরিতরকারী উৎপন্ন হয়। আর এ নদীকে কেন্দ্র করে বহু সেচ প্রকল্প গড়ে ওঠেছে। বান্দরবান অংশের চেয়ে চট্টগ্রাম অংশে এর বহুমুখী সেচ প্রক্রিয়া রয়েছে। যতটুকু অংশ পর্যন্ত সাগরের জোয়ার ভাটা রয়েছে, এতে নদীর ভাঙ্গনের ফলে নদী সিকস্তি মানুষের দুঃখ বেদনার ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি নতুন নতুন চর সৃষ্টি হয়ে নানা শস্য উৎপাদন ও দেশের তরী তরকারীর চাহিদায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে শঙ্খের চর। চন্দনাইশের খাগরিয়া, সাতকানিয়ার চরতি, আমিলাইশ, আনোয়ারার হাইলধর, বাঁশখালীর পুকুরিয়া, চাঁদপুরের চরের উৎপাদন দেশের তরিতরকারীর চাহিদা পূরণ করে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

অতীতকালে সড়ক পথের উন্নতি হওয়ার পূর্বে এতদাঞ্চলে শঙ্খনদী ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। শঙ্খনদীর কুমার খালি থেকে চানখালি হয়ে একটি সংযোগ খাল কর্ণফুলিতে পড়েছে। এ নদী পথে চট্টগ্রাম শহরের সাথে পটিয়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, চকরিয়া, পেকুয়ার অসংখ্য লোক যাতায়াত ও মালামাল আনা নেওয়া করতো। এই নদীকে ঘিরে এলাকার নর-নারীর সুখ দুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষাও আবর্তিত হতো। তাই আঞ্চলিক গানের গীতিকার গান বেঁধেছেন-
‘তুই মুখ খান গইরলা হালা
যদি আঁরে লাগে ভালা
শঙ্খনদীর মাঝি
আঁই তোঁয়ার লগে রাজি।’

আর এই শঙ্খনদীকে ঘিরে কবি আল মাহমুদ লিখেছেন-

‘জল কদরের খাল পেরিয়ে জল পায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ রেখে শঙ্খনদীর বাঁক
মন হয়ে যায় পাখি তখন মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলের ডানা মিষ্টি হওয়ার বেগ।’

আবার শঙ্খ পাড়ের কবি বলেন-
‘কালের সাক্ষী তুমি শঙ্খশবরী
এই দেশে জন্ম তোমার
এদেশেই বাসর সংসার
তোমার স্নেহের বুকে
আমার জীবন গলে চর
থানচির কিশোরী ঝর্ণা পূর্ণ যুবতী হও
প্রেমাশিয়ার উপকূল ছুঁয়ে-’
বর্ষায় শঙ্খ বড়ই খরস্রোতা। ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুকূলের ভিটেবাড়ি বাসর সংসার। তাই শঙ্খ পাড়ের কবি খরস্রোতা শঙ্খকে প্রস্তাব দেয় :
‘তুমি শান্ত হও
ষোড়শী পার্বতী ললনা
নারীত্বের লজ্জায় হও শীতের নদী
তোমাকে ভালোবাসা দেবো
তরল চাঁদের আলিঙ্গন
ভোরের ভাটায় দেবো
কোমল রবির নিবিড়তর চুম্বন
রেজিস্ট্রার্ড দানপত্র দেবো
অভিসার কুঞ্জ বঙ্গোপসাগর।’

শঙ্খনদী চলার পথে বাংলাদেশের দীর্ঘ অঞ্চলের নরনারীর হৃদয়ে স্বপ্ন গড়ে, স্বপ্ন ভাঙে, নতুন স্বপ্নের হাতছানি দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণে। এ নদীর যাত্রা কবে শুরু হয়েছিল আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমরা জানি শঙ্খ উপহার দিয়েছে জনপদ, হাট, বাজার নগর বন্দর এবং জনপদের মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। বাংলাদেশের বুকে শঙ্খনদী সগৌরবে তার বিজয় গাঁথা রচনা করবে অনন্তকাল পর্যন্ত।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.