কলকাতা তুমিও হেঁটে দেখ- ১ || সবুজ কবির

কলকাতা শহর এই উপমহাদেশের সবচেয়ে নবিন বড় শহর হলেও এর ইতিহাস এই উপমহাদেশের অন্য যে কোন শহরের তুলনায় সম্বৃদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে বোধহয় ইস্তাম্বুল ছাড়া আর কোন শহর থেকে বিশাল একটি এলাকার শাসন পরিচালিত হয়নি। ১৯১১ সাল পর্যন্ত উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন এর কেন্দ্রবিন্দু তথা রাজধানি ছিল কলকাতা ।সর্বোচ্চ সিমার সময় এই সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল আফগানিস্তান এর পর্বতশ্রেনি থেকে মালয় উপদ্বিপ হয়ে সিঙ্গাপুর এর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। বর্তমান আরব আমিরাত ও প্রশান্ত মহাসাগরিয় দ্বিপগুলির কিছু অংশও ছিল এর প্রভাবাধিন। বিপুল এই সাম্রাজ্য শাসন করতেন কলকাতায় বসে একজন ইংরেজ ভাইসরয়। একসময় বৃটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন নগরি ছিল এই কলকাতা। কারন মুল কেন্দ্র লন্ডন থেকে কলকাতা অনেক বেশি রাজস্ব সরবরাহ করত বৃটিশ সরকারকে।কালের বিবর্তনে কলকাতা এখন ভারতের একটি প্রদেশ এর রাজধানি মাত্র। তবুও এর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমেনি।
দির্ঘদিন কলকাতাই ছিল এই বাংলাদেশেরও প্রধান কেন্দ্র। কলকাতা কে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের জাতিয়তাবাদ এর উন্মেষ । ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারত থেকে মানুষ এসে বসতি স্থাপন করত বৃটিশ সময়ে। যা কলকাতাকে ভারতের প্রথম কসমোপলিটন শহর এর মর্যাদা দিয়েছে। েইংরেজদের দ্বারা স্থাপিত হলেও প্রথমথেকেই কলকাতায় অন্য দেশিয় ইউরোপিয় অনেক বাসিন্দা ছিল। স্থানিয় হিন্দু-মুসলিমরা তো ছিলই। কলকাতা সম্পর্কে জাতিয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান এর মন্তব্য “ ভাল হোক মন্দ হোক কলকাতা শহরের আকর্ষনিয় একটি সত্তা ছিল। সর্বদাই এ শহর কর্মচঞ্চল ও জিবনের বিচিত্র অভিবক্তির লিলাক্ষেত্রে। নির্জন অন্তরাল থেকে প্রচন্ড উন্মতত্তা কলকাতা শহরকে একটি বিপুল বিস্ময়এর রাজ্যে পরিনিত করেছিল। যাকে বলে পার্সোনালিটি বা ব্যাক্তিত্ব, কলকাতা শহরের তেমনি একটি ব্যাক্তিত্ব ছিল। এই ব্যাক্তিত্বের আকর্ষণ ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী। আমি এই ব্যাক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলাম ।“ উপমহাদেশের অনেক উত্থান-পতন এর মধ্যেও কলকাতা তার এই ব্যাক্তিত্ব হারায়নি। এখনও এই শহর আকর্ষন করে তার সর্বগ্রাসী ব্যাক্তিত্ব দিয়ে। উর্দু কবিতার উপমায় কলকাতা যেন এক জ্বলন্ত আগুন যা পতঙ্গকে ডেকে আনে মৃত্যুর দিকে।
কলকাতা শহর এর ইতিহাস বেশি দিন এর নয়। মুঘল আমলে গঙ্গা তথা হুগলি নদির অপর পারে হাওরাতে মফস্বল শহর থাকার প্রমান থাকলেও কলকাতা ছিল গ্রাম। সেখানে লোক বসতি ও বেশি দিন ছিল বলে মনে হয়না।সুন্দরবন বিস্তৃত ছিল কলকাতা জুড়ে। বন্যা ও অন্যান্য কারনে সেখানে বসতি কখনও গড়ে উঠত কখনও আবার বিরান হয়ে যেত। মুঘল ও তার পুর্ব অামলে এই অঞ্চলটির বিশেষ কোন গুরত্ব ছিলনা। আরো উত্তরে হুগলি শহর ছিল মুঘল প্রশাসনিক কেন্দ্র। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে এই গ্রামিন এলাকাটি ছিল সাবর্ন চৌধুরি পরিবারের জমিদারি এলকা। কয়েকটি ছোট ছোট গ্রাম আর কালিঘাট এর মন্দির নিয়ে ছোট্ট একটা জনপদ। সবসময় যেটা বাঘ আর বন্যার মত বিপদের মোকাবিলা করে টিকে থাকে। এই জনবিরল এলকাটাকে গুরুত্বপুর্ন অঞ্চল এ পরিনিত করার কৃতিত্ব যার সেই লোকটি হচ্ছেন জোব চার্নক।
দির্ঘদিন জোব চার্নক কে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা বলা হত কিন্তু ২০০৩ সালে ভারতিয় সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে এই দাবি নাকচ করে দেয় যে কলকাতায় চার্নক এর পুর্বেও লোকবসতি থাকার যথেষ্ট প্রমান আছে। যদিও এখানে একটি আধুনিক শহর প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব চার্নক এরই। ল্যাংকাশায়র এর অধিবাসি চার্নক ইষ্ট ই্ন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে ভারতে আসেন ১৬৫৯ সালে। প্রথমে নিযুক্ত হন কোম্পানির পাটনা কেন্দ্রে। পরে ত’কালিন মোগল প্রশাসনিক কেন্দ্র হুগলির নিকটবর্তি কাশিমবাজার কুঠির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারি হন ১৬৮৫ সালে। এ্ সময় থেকেই ব্যবসার সুবিধার জন্য কোম্পানি বিভিন্ন অসুদপায় নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। চার্নক মুঘল কেন্দ্র থেকে দুরে কোথাও শক্তিশালি দুর্গ তৈরির পরিকল্পনা করেন। তার পরিকল্পনা অনুসারে ১৬৮৮ সালে চার্নক বাংলায় কোম্পানির প্রধান এজেন্ট হিসেবে চট্টগ্রাম দখল এর চেষ্টা করেন। কিন্তু তার চেষ্টা ব্যার্থ হয় এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে বেশ দুরে চট্টগ্রাম দখল ভবিষ্যত এর জন্য ভাল হবেনা বলে কোম্পানির ডিরেক্টর রা মত প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১৬৯০ সালে ইতিপুর্বে নানা অভিযোগে ইংরেজদের উপমহাদেশে বানিজ্য করার উপার দেওয়া নানা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও দেশে ইংরেজদের বানিজ্য কুঠি স্থাপন এর অনুমোদন দেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। এই ফরমান পেয়ে চার্নক সিদ্ধান্ত নেন যে নতুন কুঠি স্থাপন করতে হবে মুঘল প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দুরে যাতে করে তাদের দেশ দখল এর ষড়যন্ত্র অবাধে চলতে পারে। গঙ্গা নদি বেয়ে দক্ষিন দিকে তিনি উপস্থিত হন বর্তমান কলকাতা অঞ্চল এ। বন্দর এর জন্য উপযুক্ত গভিরতা, সুপেয় পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা ছিল এখানে। তিনি স্থানটি পছন্দ করেন এবং রাজকিয় ফরমান এর সুযোগে স্থানিয় জমিদার দের থেকে এই স্থানে বসবাস করার অনুমোদন পান। তিনি গড়ে তুলেন প্রথম ইংরেজ কুঠি এবং কলকাতা, সুতানটি ও গোবিন্দপুর গ্রাম কে কেন্দ্র করে কলকাতা শহরের ভিত্তি গড়ে উঠে এই কুঠি থেকেই।
কলকাতায় কুঠি স্থাপন এর দু বছরের মধ্যেই চার্নক এর মৃত্যু হলেও এখানে ইংরেজদের অবস্থা থেকে যায়। ইতিমধ্যে বাংলায় মুঘল দুই শক্তিশালি শাসক নবাব শায়েস্তা খান ও নবাব মীর জুমলা ইংরেজদের যথেষ্ট চোখে চোখে রাখলেও এদের পর বাংলার প্রশাসকরা তাদের প্রতি অত মনোযোগ দেননি।১৬৯৮ সালে এই এলাকার জমিদারি সাবর্ন রায় চৌধুরিদের হাত থেকে কিনে নেয় ইংরেজরা।সম্রাট আওরঙ্গজেব এর ইন্তেকাল এর পর মারাঠা আক্রমন ও অন্যান্য ইউরোপিয় শক্তির সাথে গোলযোগ এর অযুহাতে ইংরেজরা নিরাপত্তার জন্য দুর্গ তৈরির অনুমতি চাইলে বাংলার তখনকার দুরদৃষ্টিহিন নবাব সেই অনুমতি দেন তাদের। ১৭১২ সালে গড়ে উঠে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। এই দুর্গকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় জনবসতি। গড়ে উঠতে শুরু করে কলকাতা শহর।
কলকাতা ও ফোর্ট উইলিয়াম কে কেন্দ্র করে শক্তিশালি ইংরেজ বাহিনি গড়ে উঠে। একসময় এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব এত বেড়ে যায় যে রাজধানি মুর্শিদাবাদ ও ঢাকা বা পাটনার মতই গুরুত্ব পুর্ন শহর হয়ে যায় কলকাতা। বাংলার নবাব আলিবর্দি খান ইংরেজদের এই শক্তি বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতন হলেও বাধা দিতে পারেননি। তিনি ব্যাস্ত ছিলেন মারাঠা আক্রমন প্রতিরোধ করতে। বরং বিদেশি বনিক হিসেবে ইংরেজদের নিরাপত্তার জন্য দুর্গের শক্তি বৃদ্ধি ও কলকতা শহর েএর পাশে মারাঠা অশ্বারোহি বাহিনি প্রতিরোধ এর জন্য খাল খনন এর অনুমতি দেন। ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হন সিরাজউদ্দৌলা। তাকে প্রথম থেকেই উপেক্ষা ও তার শত্রুদের আশ্রয় দেয় কলকাতা কেন্দ্রিক বৃটিশ প্রশাসন। সিরাজ কলকাতা আক্রমন করেন। এই যুদ্ধে সিরাজ সেসময় এর প্রচলিত মুঘল যুদ্ধ পদ্ধতি অশ্বারোহি দ্বারা প্রধান আক্রমন এর নিয়ম এর বদলে প্রচুর গোলাবর্ষন ও পদাতিক সৈন্য দ্বারা আক্রমন করে দুর্গ দখল করেন। জোব চার্নক কলকাতা কে পছন্দ করেছিলেন মুলত এর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যই। অসংখ্য খাল ও জলাভূমি দ্বারা বদ্ধ কলকাতায় দ্রুতগামি অশ্বারোহি বাহিনি কিছুই করতে পারত না। কিন্তু বাংলার নবাব এর কোন কার্যকর নৈৗবাহিনি ছিলনা। ফলে দুর্গ হারালেও বৃটিশ বাহিনির বেশিরভাগ অংশ জাহাজে করে কলকাতার দক্ষিনে ফলতা অঞ্চলে পালিয়ে যায়। কয়েকমাস এর মধ্যে সেসময় বৃটিশদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র মাদ্রাজ থেকে অতিরিক্ত সেনাবাহিনি আসে। সিরাজ এর নিযুক্ত কলকাতার প্রশাসক মানিক চাঁদ কে ঘুষ দিয়ে লর্ড ক্লাইভ পুনউদ্ধার করেন কলকাতা।তারপর ১৭৫৭ সালের ২৩ এ জুন পলাশির প্রান্তরে নবাব সিরাউদ্দৌলাকে পরাজিত করে লর্ড ক্লাইভ স্থাপন করেন ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান খুটি।
১৭৫৭ সাল থেকেই কলকাতা হয়ে উঠে নিয়ন্ত্রক কেন্দ্র। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম এর সাথে এলাহাবাদ চুক্তি মোতাবেক বাংলা,বিহার ও উরিষ্যার বৈধ প্রশাসন ক্ষমতা পায় বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এর পর আনুষ্ঠানিক ভাবে মুর্শিদাবাদ এর পরিবর্তে কলকাতাকে ঘোষনা করা হয় রাজধানি। । মাদ্রাজ আর বোম্বে থেকে কোম্পানির প্রধান প্রশাসনিক দফতরগুলিও সরিয়ে আনা হয় এখানে। আর এই শহর কে কেন্দ্র করে ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পরে।

ছবি- ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল কলকাতা।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.