রিকশা চালিয়ে দুই ছেলের বিসিএস এক ছেলের এমবিবিএস

সন্ধ্যা নামার কিছু আগে আত্মীয়ের বাসা থেকে নিজ বাসায় ফেরার জন্য রিকশা খুঁজছি। সামনেই একটি খালি রিকশা দেখে বলি চাচা যাবেন? রিকশা থামিয়ে শুদ্ধ ভাষায় বিনয়ের সঙ্গে চাচা জানতে চাইলেন, কোথায় যাবেন বাবা? জায়গার নাম বলে ভাড়া জানতে চাইলে চাচা বলেন, গরিব মানুষ যা দেন। কোন দিক দিয়ে যাবো বলে দিয়েন।

রোববার (০৪ ডিসেম্বর) খুলনার ট্যাঙ্ক রোডের বড় মসজিদের সামনে থেকে চাচার রিকশায় বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হই। চলতে চলতেই কথা হয় রিকশাওয়ালা চাচার সঙ্গে। চাকা গড়াতে গড়াতে কথা বলে চাচার নিজের ও পরিবারের সম্পর্কে জানতে পেরে অবাক হই। জানতে পারি, রিকশা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করে তিন ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

রিকশাচালক এ চাচার নাম আব্দুল খালেক শেখ (৮১)। গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের কাঁঠাল গ্রামে হলেও স্বাধীনতার পর থেকে তিনি খুলনায় বসবাস করেন। খুলনা শিপইয়ার্ডে বেশ কয়েক বছর চাকরি করেছেন। এখনও থাকেন সেই এলাকায়। ৪০ বছর বয়সে করেছেন বিয়ে। তিন ছেলের বাবা। স্ত্রী ফাতেমা এক সময় খুলনার বন্ধ হয়ে যাওয়া দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন।

ছেলেরা কে কি করেন জানতে চাইলে তিনি জানান, বড় ছেলে টুটুল শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ৩৪তম বিসিএস দিয়ে গাইবান্ধা জেলায় কিছুদিন আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। মেজ ছেলে ইব্রাহিম শেখ খুলনার সরকারি বিএল কলেজ থেকে একই বিষয়ে পড়াশোনা করে ৩৬তম বিসিএস পাস করে ঢাকায় আছেন। আর ছোট ছেলে সোহরাব শেখ খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে ইন্টার্ন করছেন। গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি বিভাগে প্র্যাকটিসও করছেন।

চাচার কাছে তার ছেলেদের এমন কৃতিত্বের কথা শুনে বার বার শ্রদ্ধা জানাতে ইচ্ছা করছে। কারণ আমাদের সমাজের অনেকেই তাদের বয়সী রিকশাচালকদের বলে থাকেন- এই খালি যাবে/যাবি? বা এই রিকশা যাবে/যাবি? বাসায় আসার পথে জীবনযুদ্ধে জয়ী দরিদ্র আব্দুল খালেক আরও অনেক কথাই বলেন।

তিনি বলেন, নিজে শিক্ষিত হতে না পারলেও ছেলেদের পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করিনি। সংসার চালাতে কষ্ট হলেও ছেলেদের শিক্ষিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। তবে আমার একার চেষ্টা নয় ছেলেদের প্রবল আগ্রহ আর মেধার কারণে তারা শিক্ষিত হতে পেরেছে।

ছেলেদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার একার আয়ে অনেক সময় পারতাম না। তাই ওরা প্রাইভেট পড়িয়ে নিজেদের পড়ার খরচ যুগিয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনায় স্ত্রী আমাকে সহযোগিতা করেছে।

গর্বিত পিতা আব্দুল খালেককে তার জীবনের স্বার্থকতা কি জানতে চাইলে বলেন, আমি মরে গেলে সবাই বলবে ওদের তো মানুষের মতো মানুষ করেছি। আশা করছি ছেলেদের যেখানে পৌঁছে দিতে পেরেছি তাতে তাদের কাজের কারণে কেউ আমাকে গালি দিতে পারবে না।ছেলেরা রিকশা চালাতে নিষেধ করে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছেলেরা রিকশা চালানো ছেড়ে দিতে চাপ দিচ্ছে। ওরা পুরোদমে বেতন পেলে ছেড়ে দিবো। বাসার সামনে পৌঁছে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে রিকশাওয়ালা চাচা তার বাসায় যেতে বার বার অনুরোধ জানান। ভাড়া দেওয়ার পর একটি ভিজিটিং কার্ড চেয়ে নিয়ে মোবাইলে কথা বলবেন বলে অন্য ভাড়া নিয়ে চলে যান দুই বিসিএস সম্পন্ন ও এক এমবিবিএস চিকিৎসকের গর্বিত এ বাবা।

banglanewsweb

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.