সালতামামি ২০১৭: বছরজুড়ে বাঁশখালী

মুহাম্মদ তাফহীমুল ইসলাম: ২০১৭ আজই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। রাত বারোটার পরেই শুরু হবে নতুন বছরের যাত্রা। ২০১৭ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেও স্মরনীয় হয়ে থাকবে হৃদয়ে তার সময়কালে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর মাধ্যমে। যেমনটা বলা যায়- নায়করাজ রাজ্জাক, মেয়র আনিসুল হক, চট্টলবীর মহিউদ্দীনকে আমরা হারিয়েছি এই ২০১৭ সালেই। এমন গুনীজনদের মৃত্যুর তারিখ হিসেবে আমাদের মাঝে স্মরনীয় হয়ে থাকবে এই বছরটি। পুরো দেশের ন্যায় এই বিদায়ী বছরটিতে আমাদের বাঁশখালীতেও ঘটেছে বেশ কিছু ঘটনা। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনার সংক্ষেপ রূপ পাঠকমহলের জন্য তুলে ধরছি।
এক: প্রথমে তুলে ধরছি ২০১৭ সালের প্রথম ছয় মাস তথা অর্ধবছরের কিছু ঘটনাবলী। যে ঘটনাবলী একদিকে আমাদের সম্মানিত করেছে অন্যদিকে আঘাতও করেছে। প্রথম ছয় মাসে বাঁশখালীর রক্তাক্ত জনপদ গন্ডামারার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে ফের রক্তাক্ত হয় গন্ডামারা। তাতে অসহায় মানুষের গায়ের রক্ত মাটিতে পড়ে। এরপর ইউপি নির্বাচনে আমরা নতুন নেতৃত্ব পাওয়ার আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার পাশাপাশি কাঁদতেও হয়েছে ভাইয়ের রক্ত ঝরার কারণে। কর্তাদের নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে বলি হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। যার কারণে আনন্দ তলিয়ে যায় ভাইয়ের রক্তের ঢলে। এই বছরেই বানীগ্রামে ভাঙ্গা হয়েছে ১৬০ বছরের প্রাচীন মসজিদ। যা আর ফিরে পাওয়া কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। হাঁজীগাও উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে এই বিদায়ী বছরে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আগমন করে আমাদের এই জনপদকে ধন্য করেছেন। এভাবে আরো বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে আমাদের প্রিয় বাঁশখালীতে। যেই ঘটনাগুলো আমাদের বাঁশখালীকে দেশব্যাপী প্রশংসিত ও ঘৃনিত করেছে।

দুই: এবার তুলে ধরছি শেষ ছয় মাসের কিছু ঘটনাবলী। শেষের ছয় মাসের শুরুর দিকে অর্থাৎ জুলাইয়ের শুরুর দিকে মোবাইল কোর্ট মামলায় সুপ্রিম কোর্টে বাঁশখালীর কৃতি সন্তান ব্যারিস্টার হাসান আজিম দোলন সফলতা লাভ করেন।

এরপরে আমাদের বাঁশখালীতে আগমন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বাঁশখালী এসে মন্দির উদ্বোধনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই বিদায়ী বছরে বাঁশখালীর তিন কৃতি সন্তান চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক হওয়ার সৌভাগ্যও অর্জন করে। যা আমাদের বাঁশখালীবাসীর জন্য গৌরবের। তাছাড়াও আমাদের বাঁশখালীতে ছিলো না কোন সরকারী কলেজ। প্রথমবারের মতো বাঁশখালী আলাওল ডিগ্রি কলেজও সরকারীকরণ করেন বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। যা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বড় একটা সাফল্য।

এই বছরে সরকারীকরণ হয়েছে বাঁশখালী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। মাষ্টার নজির আহমদ ডিগ্রি কলেজ অনার্স কোর্সে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে বাঁশখালীর অগ্রযাত্রাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান এই বছরে। তাছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে যেই ঘটনাগুলো আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। আসুন, জেনে নিই সেই ঘটনাগুলোও।

২০১৭ সালে বাঁশখালী পেয়েছে মাসুমা শিমুল, এনামুল হক নামের দুইজন বিসিএস ক্যাডার। বাঁশখালীর পুকুরিয়া ইউনিয়নের কৃতি সন্তান আবরার এ আনোয়ার স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক মালয়েশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন এই বিদায়ী বছরটিতে। বিদায় নিতে যাওয়ার আগ মূহুর্তেও এই বছরটি আমাদেরকে এনে দিয়েছে দুইটি কামিল মাদরাসা। নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠিত হয়েছে ক’দিন আগে। এছাড়াও এই বিদায়ী বছরে বাঁশখালীর মাষ্টার নজির আহমদ শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য মরনোত্তর স্বর্ণপদকে ভূষিত হন, বাঁশখালীর কৃতি সন্তান দুই সহোদর মোস্তাফিজুর রহমান ও মুজিবুর রহমান ‘সিআইপি’ পদক লাভ করেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র,বাঁশখালীর কৃতি সন্তান মাহমুদুল ইসলামের দক্ষতার পরিপ্রেক্ষিতে মওকুপ তৈলারদ্বীপ সেতুর টোল আদায়। যা কয়েকমাস বন্ধ থাকার পর ফের চালু হয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে।

চট্টগ্রাম দক্ষিনজেলা ছাত্রলীগের কমিটির শীর্ষপদে স্থান পায় আমাদের বাঁশখালীর সাত কৃতি সন্তান, বিজয় দিবসে ইউএনও পুরো বাঁশখালীর সকল প্রতিষ্ঠানে একই সাইজের পতাকা লাগিয়ে রেকর্ড করেন, এছাড়াও বিজয় দিবসে বাঁশখালীর কৃতি সন্তান আবদুল্লাহ কবির লিটনের নেতৃত্বে বের হয় বর্নাঢ্য র্যালী। যা বাঁশখালী ছাড়াও পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে আলোচিত হয়। শেষ ছয় মাসের এসব ঘটনাবলী আমাদের জন্য আনন্দের, গৌরবের। এর বিপরীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে যা আমাদের জন্য দুঃখের, বেদনার।

এবার তুলে ধরছি বেদনাদায়ক সেসব ঘটনাবলী। ২০১৭ সালটি বাঁশখালীর রাজনীতির জন্য ছিলো একটি ভয়ানক বছর। এই বছরটিতে বাঁশখালীতে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ঝরেছে সাধারণ মানুষের রক্ত। উপজেলা আওয়ামী লীগ কর্তৃক শ্রমিকদের উদ্যোগে আয়োজিত মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান প্রতিহতের ঘোষনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয় বাঁশখালীর রাজনৈতিক ময়দান। পালিত হয় শ্রমিকদের ডাকে ধর্মঘট। যেই ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়ে বাঁশখালী। বাঁশখালীতে শুরু হয় মামলা-হামলার রাজনীতি। যার জন্য বিপাকে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। বৈলছড়ীর চেয়ারম্যানের ঘরে দেয়া হয়েছে আগুন। সেই ঘরপোড়া মামলায় চেয়ারম্যানের মামলায় একই ইউনিয়নের মেম্বারকে যেতে হয়েছে কারাগারেও। আবদুল্লাহ কবির লিটনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদানের পথে একই দলের প্রতিপক্ষের গুলিতে রক্ত ঝরে লিটন অনুসারীদের। যা পুরো দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় বয়ে দেয়। নিন্দার ঝড় ওঠে চারিদিক থেকে। এরপরে শান্তিপূর্ণ আনন্দ মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে হামলা বৈলছড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক টুটুন চক্রবর্ত্তীর উপর। যা রাজনৈতিক পরিবেশকে ফের উত্তপ্ত করে। বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার দায়ে বাঁশখালীরসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১৩ শিক্ষককে যেতে হয়েছে কারাগারে। যা বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে গুরুত্বের সাথে। সম্প্রতি মহিউদ্দীন চৌধুরীর মেজবানে পদদলিত হয়ে পরলোক গমন করেছে বাঁশখালীর ধনা শীল। এছাড়াও এই বিদায়ী বছরে আমরা বিদায় জানিয়েছি- সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাংবাদিক সঞ্জিব চৌধুরী, সাংবাদিক পুলক সরকার, সমাজসেবী সিরাজুল কবির, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু জাহের, বদি আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সদস্য শহিদুল ইসলাম, মাষ্টার ওমর চৌধুরী, মাষ্টার জমির আহমদ, মাওলানা আবদুছ ছবুর, অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদের মতো গুনীজনকে। তাছাড়াও অনেককে হতে হয়েছে খুন, জীবন দিতে হয়েছে সড়ক দূর্ঘটনায়। যা আমাদের অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

এভাবে ভালো-খারাপ ঘটনাবলীর সাক্ষী হয়ে ২০১৭ সাল আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। এ বিদায় চিরবিদায়। আর কখনো আগমন ঘটবে না ২০১৭ সাল নামের একটি বছরের।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।

শুভ নববর্ষ

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.