জমজম কূপের সংস্কার কাজ শুরু

সৌদি আরবের মক্কায় মসজিদ আল-হারামের ভেতরে ঐতিহাসিক জমজম কুয়োসহ চারপাশের এলাকায় ব্যাপক সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্সি এবং চেয়ারম্যান শেখ আবদুল রহমান আল সুদায়েষের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, জমজমের কুয়ো মেরামতে প্রায় সাত মাস মতো সময় লাগবে।

তবে আগামী বছর রমজানের আগেই এই সংস্কারের কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, মুসলিমদের কাছে অতি পবিত্র কাবা থেকে এই জমজমের কুয়োর দূরত্ব মাত্র কুড়ি মিটারের মতো।

নতুন যে সংস্কার করা হচ্ছে, তাতে কুয়োর কাছে পৌঁছনোর সুযোগ বাড়বে, তা ছাড়া তার আশেপাশের এলাকাকেও জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘সৌদি গেজেট’ সংবাদপত্রের বরাতে বিবিসি আরও জানায়, জমজমের কুয়োকে বিশ্বের প্রাচীনতম কুয়ো বলে ধারণা করা হয়, কারণ গত পাঁচ হাজার বছর ধরে এখান থেকে একটানা পানি পাওয়া যাচ্ছে।

যদিও এই কুয়োটি মাত্র তিরিশ মিটার গভীর, তার পরেও এটি প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে আঠারো লিটার পানি পাম্প করতে পারে।

সৌদি আরবের জিওলজিক্যাল সার্ভে-র একটি জমজম স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার আছে, যারা এই পানির কুয়োর মান, গভীরতা, অম্লতার মাত্রা বা তাপমাত্রার দিকে নিয়মিত নজর রাখে।

প্রতিদিন ট্যাঙ্কারে করে অন্তত ১২০ টন জমজমের পানি মদিনার আল মসজিদ আল নবাবি-র জলাধারে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবহনের সময় সেই পানি যাতে কোনওভাবে দূষিত না-হয়, সেদিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত, মসজিদ আল-হারামের ভেতরে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে জমজম কুয়োর পানি অত্যন্ত পবিত্র ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রতি বছর যে লক্ষ লক্ষ মুসলিম তীর্থযাত্রী সৌদি আরবে যান, তাদের বেশির ভাগই জমজমের পানি নিয়ে দেশে ফেরেন।

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, হাজার হাজার বছর আগে আল্লাহ্ এই কুয়োটি সৃষ্টি করেছিলেন ইব্রাহিমের স্ত্রী ও সন্তানদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য।

হযরত ইব্রাহিম আঃ এর স্ত্রী ও সন্তানরা যখন মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত ও অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিলেন, তখন এই জমজমের কুয়োর পানিই তাদের প্রাণে বাঁচিয়েছিল।

জমজম কূপের ইতিহাস

জমজম কূপ। মক্কার মসজিদুল হারামের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি কূপ বিশেষ। পবিত্রতা ও বৈশিষ্ট্যে জমজম কূপের পানি পৃথিবীর সকল পানির চেয়ে উত্তম। কাবা ঘরের ফজিলতের সঙ্গে জমজম কূপের মাহাত্ম্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাবাঘরের ইতিহাস ও জমজম কূপ একের সঙ্গে অন্যটি গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ইতিহাসের সঙ্গে জমজম কূপের ইতিহাস বর্ণনা রয়েছে।

আল্লাহতায়ালার হুকুমে হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন শিশু ইসমাঈলসহ বিবি হাজেরাকে মক্কায় রেখে আসেন, তার কিছুদিন পর জমজম কূপের আবির্ভাব হয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) দুধের শিশু ইসমাইল ও বিবি হাজেরাকে মাত্র এক মশক পানি এবং একটি থলেতে সামান্য কিছু খেজুর দিয়ে গেলেন। হাজেরা (আ.) মক্কার নির্জন ভূমিতে কয়েকদিন পর্যন্ত ওই পানি ও খেজুর খেলেন এবং ইসমাঈলকে বুকের দুধ পান করালেন। কিন্তু এক সময় মশকের পানি ও খেজুর ফুরিয়ে এল। তিনি তখন এক চরম অসহায়তার মধ্যে নিপতিত হলেন। তার শিশু সন্তানটিও ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করতে লাগলো। হজরত হাজেরা (আ.) তখন আদরের দুলালকে দুধ পানে সমর্থ হলেন না। এমতাবস্থায় তৃষ্ণাকাতর মা পানির খোঁজে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দ্রুতবেগে দৌঁড়াতে লাগলেন। পরপর সাতবার দৌঁড়ানোর পরও কোনো পানি না পেয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। আল্লাহতায়ালা মা হাজেরার দোয়া কবুল করেন। তখন পুত্রের কাছে গিয়ে দেখলেন আল্লাহর কুদরতে তার দুই পায়ের নিচে একটি পানির ফোয়ারা জেগে উঠেছে এবং তা ক্রমশ উথলে উঠছে ও প্রবাহিত হতে চাচ্ছে। হজরত হাজেরা (আ.) তখন অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং চারদিকে পাড় বেঁধে পানি থামানোর চেষ্টা করলেন। তিনি পানিকে থামার নির্দেশ দিয়ে উচ্চস্বরে বলছিলেন ‘জমজম’ অর্থাৎ থেমে যাও। হজরত হাজেরার উচ্চারিত সে শব্দেই পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্র এ কূপের নাম হয়ে যায় ‘জমজম’।

পরবর্তীতে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায় মক্কায় মানববসতির সূচনা করে। তারা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ করতো। ঠিক ওভাবেই জুবহাম গোত্রের লোকেরা জমজম কূপের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। জুবহাম গোত্রের লোকেরা হজরত হাজেরা (আ.)-এর সঙ্গে চুক্তিসাপেক্ষে জমজম কূপের পানি পান করতো। কালক্রমে তারা মক্কাঘরের পবিত্র মালামাল লুণ্ঠন ও চুরি করতে লাগলো। তারা নানা পাপাচারে লিপ্ত হলো। ফলে আল্লাহর হুকুমে এক সময় জমজম কূপের পানি শুকিয়ে গেল। সংস্কারের অভাবে একসময় জমজম কূপের স্থান ভরাট হয়ে যায়। মানুষ এই কূপের বরকত ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।

খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর সূচনাতে হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর একজন দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী পুরুষের নেতৃত্বে কাবাগৃহের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কুরাইশরা ফিরে পায়। তাদের চতুর্দশ পুরুষ খাজা আবদুল মুত্তালিব জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা। তখন আবদুল মুত্তালিব জমজম কূপ অনুসন্ধানে আগ্রহী ও উদ্যোগী হন এবং তার এক পুত্র যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে জমজম কূপের নিশানা খুঁজে পান এবং কূপটি দেখতে পান।

স্বপ্নের চিহ্ন অনুযায়ী তিনি তার পুত্র হারেসকে সঙ্গে নিয়ে কূপ খননকার্য শুরু করেন এবং বাস্তবেই জমজম কূপ আবিষ্কারে সক্ষম হন। তখন থেকে আবার মানুষ এ কূপের যত্ন নিতে শুরু করেন। জমজম কূপ পৃথিবীর সবচাইতে পবিত্রতম, বরকতময় কূপ। এর পানি পৃথিবীর সর্বোত্তম ও সুস্বাদু পানি।

বিভিন্ন হাদিসে এ পানির কল্যাণের কথা উল্লেখ আছে। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, জমজমের পানি যে নিয়তে (নেক উদ্দেশ্যে) পান করা হয় তা পূরণ হয়। জমজমের অশেষ কল্যাণ ও বরকতের কথা অনেক হাদিসে রয়েছে। হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানি সম্পর্কে বলেছেন, যে তা হচ্ছে বরকতময় এবং তৃপ্তিদায়ক। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পৃথিবীর সর্বোত্তম পানি হচ্ছে জমজমের পানি।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে পানি উত্তোলন করতেন এবং পান করতেন। জমজমের পানি শুধু তৃষ্ণাই নিবারণ করে না, এর মধ্যে ক্ষুধাও নিবারণের যোগ্যতা রয়েছে। এ পানি মানুষের শরীরের স্বস্তিও প্রবৃদ্ধি করে এবং হজমে সহায়তা করে। এছাড়া জমজমের পানির বাহ্যিক বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ পানি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত। জমজম কূপের আরো একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এ থেকে লাখ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করলেও এর পানিতে কখনো স্বল্পতা দেখা যায় না।

জমজম কূপ মূলত মহান আল্লাহতায়ালার এক কুদরতের নিদর্শন। মক্কায় হজ ও উমরা করতে আসা লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর লাখ লাখ টন পানি পান করে ও বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু কখনও পানির স্বল্পতা দেখা যায়নি। বস্তুত একথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, জমজম কূপ মানুষের জন্য বিশেষ করে হাজিদের জন্য আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত ও বরকতময় উপহার।

বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন সউদ জমজমের পূর্ব ও দক্ষিণে পানি পান করানোর জন্য দুটি স্থান নির্মাণ করেন। দক্ষিণ দিকে ৬টি এবং পূর্বদিকে ৩টি টেপ লাগানো হয়।

বর্তমানে কাবা ঘরের ২১ মিটার দূরে অবস্থিত এই কূপটি থেকে ২০ লক্ষাধিক ব্যারেল পানি উত্তলিত হয়। এই কূপটি বর্তমানে আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে। এই কূপের পানি বণ্টনের জন্য ১৪০৩ হিজরিতে সৌদি বাদশাহের এক রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী হজ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইউনিফাইড ‘জামাজেমা দফতর’ গঠিত হয়। এই দফতরে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্টসহ মোট ১১ জন সদস্য ও ৫ শতাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.