সানজিদা হাবিবের গল্প || পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটা

পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটা…

সানজিদা হাবিব

…পাশের ফ্ল্যাটে একটা ছেলে থাকে। তার পড়ার টেবিলটা আমার রুম থেকে সরাসরি দেখা যায়। ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ছেলেটা পড়তে বসে আর দশটায় পড়ার টেবিল থেকে উঠে মে বি ডিনার করতে যায়। কারণ জানালার পর্দা নেমে গেলে ওপারের খবর আর জানা যায়না…
.
….আমিও একই সময়ে পড়তে বসি। যতনা পড়ায় মন দিই, তার চেয়ে বেশী ছেলেটার দিকে। আচ্ছা!!শুধুআমিই কি সবসময় ওই ছেলেটাকে দেখি?? ও দেখেনা??? হয়তো দেখে, হয়তো নাহ….
.
….ওরা তিন বছর হলো পাশের ফ্ল্যাটে এসেছে। খুব কিউট। চোখে সবসময় চশমা পরে। চশমিশ ছেলেগুলোকে সবসময় দেখতে ইনোসেন্ট লাগে। চশমা পড়ার একটা সুবিধা আছে। এরা কখন কার দিকে তাকায় ঠিক বুঝা যায়না…
.
…..খবর নিয়ে জেনেছি ওর নাম রোহান।অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। যাইহোক, আমার সিনিয়র। না হলে আমাকে দেখে ‘জান’ শব্দের বদলে ‘আপু’ শব্দটায় ওর মুখে উচ্চারিত হতো….
.
….এই তিনবছর ধরে ওকে একইভাবে দেখে আসছি। কখনো কথা বলিনি ওর সাথে। কথা বললেও হয়তো পছন্দের বা ভালোবাসার কথা বলা হতোনা। আর আমি মোটা আর দেখতে কালো বলে সবসময় দ্বন্দ্বে থাকি?? ও আমাকে ভালোবাসবেতো?? নাহ,ও এর চেয়ে কিউট মেয়ে ডিসার্ভ করে….
.
…..এফবিতে লগ ইন করেছি। খুব ভালো একটা বন্ধু আছে এফবিতে। কখনো অবশ্য দেখা হয়নি, ছবিও দেখিনি তার। প্রোফাইলে রোনালদোর ছবি দেওয়া, দু’বছর ধরে এই প্রোফাইল পিকটাই আছে। আইডির নামটাও ভারী অদ্ভুত!’জোনাকি পোকা।’হাহাহা…..
.
….আজ জোনাকি পোকার বার্থডে।এফবিতেই উইশ করেছি, মোবাইল নাম্বার অনেকবার খুঁজলেও দেইনি ওকে। আজ ও খুব রিকোয়েস্ট করতেছে বার্থডে গিফট হিসেবে ওর সাথে মিট করার জন্য।রোহানের সব কথাইতো জানে। দ্বন্দ্বে পড়ে গেছি। আর সাতপাঁচ না ভেবে বিকেল ৪টায় শিশু পার্কে আসতে বললাম। মানলাম আমরা শিশু নাহ, কিন্তু লাভারও তো নাহ যে ডিসি হিল, সিআরবি ঘুরতে যাবো?…
.
….বিকেল ৪.৩০মিনিট। শিশু পার্কে আধ ঘন্টা ধরে বসে আছি। ছেলেগুলো এমনই হয়। সবসময় ওয়েটিং এ রাখে। দূর থেকে একটা ছেলেকে দেখা যাচ্ছে।
রোহান নাহ তো??
হুম, রোহানইতো।
এদিকেই আসছে। হঠাৎ ও এখানে??
কার সাথে দেখা করতে এসেছে সে??…
.
….
-সরি অনেক্ষণ ওয়েট করতে হলো আমার জন্য।
-কিন্তু, আমি তো…
-চল, কোথাও বসি।
আমি তো পুরাই থ! বাধ্য বালিকার মতো তাকে অনুসরণ করলাম….
.
-আমি জোনাকি পোকা!
-তার মানে তুমি ওই আইডি থেকে….
-হুম, আসলে আমি যখন পড়তে
বসতাম তখন প্রায়শ চশমার আড়ালে
দেখতাম তুমি আমার দিকে তাকিয়ে আছো।
-হুম,তারপর?
-প্রতিদিন এই ঘটনা রিপিট হওয়ার
পর বুঝলাম তুমি আমাকে পছন্দ করো।
দেন তোমাদের নীচের ফ্লোরের শাহেদ
ভাইয়ের কাছে থেকে তোমার সম্পর্কে
জিজ্ঞাসা করলাম।
-কি বললেন ওনি??
-কি বলেছেন বলবোনা,
তবে এটুকু জেনে রাখো খারাপ কিছু বলেননি…
.
-হুম,তারপর??
-তোমার এফবি আইডিটা ওনার
কাছ থেকেই নিয়েছি।
কি রকম মেয়ে তুমি??
রোহানকে ভালোবাসো বলে
‘জোনাকি পোকা’ কে দু’পঁয়সার দামও দিতানা???
-তারপর???
-তারপর আমি তোমাকে ভালোবাসি।
-হুম,,আমিও…কিন্তু আমি খুব কালো, মোটা, কিউট নাহ
-আচ্ছা ভালোবাসার জন্য কি
কিউটনেস এর দরকার হয়??
আর সব মেয়েরাই যদি ফর্সা হয়,
তবে আমাদের যাদের শ্যামলা বা
কালো মেয়ে পছন্দ নাহ, তাদের
কি হবে বলোতো??…
.
…ছেলেটাকে যতটা ইনোসেন্ট মনে হয়, ততটা নাহ। কি সুন্দর আমাকে দ্বন্দ্বে ফেলে দিলো!!!…
.
-আমি পারফেক্ট নাহ
-মিস রিয়া! ভালোবাসার জন্য পারফেকশন
এর দরকার হয়না,বুঝলে??
-আচ্ছা…???
-হুম….
-অনেক ভালোবাসি তোমায়…
-আমিও.
.
….মনের অজান্তেই তার কাঁধে মাথা রাখলাম। হুম,এইভাবে তার কাঁধে মাথা রেখে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাই…
.
….আজ একটি জিনিস বুঝতে পারলাম।ভালোবাসার জন্য কিউটনেস বা পারফেক্ট হওয়ার দরকার হয়না। দরকার একটি সুন্দর মনের। যারা তা বুঝেনা তারা ভালোবাসতেই জানেনা। তারা ভালোবাসা পায়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়না…

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.