বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কিছু স্মৃতি || রেজাউল হক মুশতাক

আগস্ট মাস বাঙ্গালি জাতির শোকের মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙ্গালি জাতির কপালে কলংকের তিলক একেঁ দিয়েছিল এদেশীয় একদল দুর্বৃত্ত । স্বাধীন বাংলাদেশ নামক ভুখন্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তরা সেদিন চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলতে ! কিন্তু যে নামটি বাঙ্গালির হৃদয়ে গাথাঁ, যে নামটি শুনে ১৯৭১ সালে এদেশের কৃষক , শ্রমিক , ছাত্রজনতা পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল, সে নামটি এত সহজে বাঙ্গালির হৃদয় থেকে মুছে যাবে নরপেশুরা সেদিন তা বুঝতে পারেনি।

যে মানুষটি একদিন আমার মতো লাখো ছাত্র জনতার মনে চেতনার উম্মেষ ঘটিয়েছিলেন, দেশপ্রেমের দীক্ষা দিয়েছিলেন , যার ভাষণ শুনে আমরা রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলাম , রাজনীতিকে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান মনে করেছিলাম, স্বাধীন দেশেই মাত্র কয়েক বছরের মাথায় তাকে আমাদের হারাতে হয়েছে । আগস্ট মাস আসলেই আমরা তার শোকে আজ মূহ্যমান হয়ে যাই ।
বাঙ্গালি জাতির প্রিয়নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি আজও আমার মানসপটে ভেসে ওঠে । আমৃত্যু আমি এসব স্মৃতি ধারণ করে যাব । বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্য পুত্র শেখ কামাল ঢাকা কলেজে আমার বন্ধু হওয়ায় পর থেকে আমি প্রায়সময় ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ীতে যেতাম। কামালের বন্ধু আর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এই দুই পরিচয়ের কারণে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন । বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ আর অদৃশ্য এক মায়ার বন্ধন আমাকে কারণে অকারণে ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ীতে টেনে নিত। চোখ বুঝে এখনও আমি অনুভব করি বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব, আমার পিঠে বুলানো বঙ্গবন্ধুর স্নেহের হাত । আমার সেই সুখস্মৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ অর্জন।

লালদিঘীর ময়দানে ৬দফার পক্ষে শেখ মুজিবের প্রথম জনসভা:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানের এক জনসভায়। ঐতিহাসিক ৬দফা কর্মসূচি ঘোষণার উপর এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম জনসভা। আমি তখন চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র, একই সাথে স্কুল ছাত্র সংসদের র্বিাচিত সাধারণ সম্পাদক। লালদিঘীর ময়দান ছিল মুসলিম হাই স্কুলের খেলার মাঠ। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো লালদিঘী ময়দানে কর্মসূচি পালন করতো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সেদিন আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। তাঁর ভাষণ আমাকে বিমোহিত করল, রক্তে আগুনের ঢেউ খেলে গেল। বাঙ্গালি জাতি সত্তার ভবিষ্যত নেতাকে এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। মনে মনে দীক্ষা নিলাম, ৬দফার সক্রিয় কর্মী হিসেবে শুরু হলো আমার নতুন যাত্রা ।

আগরতলা মামলার সামরিক ট্রাইব্যুনালে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়া:
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক । মামলার প্রধান আসামী বিকাশমান বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিব । ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে তখন মামলার ট্রায়াল চলছিল । আমি তখন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক । প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছিল প্রিয় নেতাকে একবার দেখতে যাওয়ার । কিন্তু এতে ঝুঁকি যেমন আছে , তেমনি দেখতে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাও ছিল বেশ জটিল। চিন্তা করতে থাকলাম কিছু একটা উপায় বের করতে , কয়েকদিনের মধ্যে একটি উপায়ও বের হয়ে গেল । আগরতলা মামলার অন্যতম কৌশলী এডভোকেট মশিউর রহমান (তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ন্যাশনাল এসেম্বলীল এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন । পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় মন্ত্রীসভার সদস্যও ছিলেন । মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরে তাঁকে আটক করে এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে । ) হলেন ঢাকা কলেজের আমার সহপাঠী মাহমুদুর রহমানের বাবা। মশিউর চাচার কাছে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম, আমার কথা শুনে তিনি আশ্চর্য হলেন । আমাকে নানা প্রকার ভয়ভীতি ও শংকার কথা বলে নিভৃত করার চেষ্টা করলেন । কিন্তু আমি তো নাছোড় বান্দা, আমার প্রচন্ড আগ্রহ ও আবদার মেনে নিয়ে অবশেষে তিনি রাজী হলেন । সামরিক আদালতে যাওয়ার জন্য তিনি আমাকে একটি পাস সংগ্রহ করে দিলেন । ঐতিহাসিক সেদিনটি ছিল ৮ই আগস্ট ১৯৬৮সাল।
আমার মাঝে সে কি উত্তেজনা, বাঙ্গালির মুক্তিকামী জনতার প্রিয়নেতা শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার অধীর আগ্রহের অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না ! অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটালাম, পরের দিন সকাল ৭.০০ টার মধ্যে আমাকে মশিউর চাচা তাঁর ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত থাকতে বললেন। যথারীতি পরের দিন সকালে আমি এডভোকেট মশিউর চাচার ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত হলাম। মশিউর চাচার ছেলে আমার বন্ধু মাহমুদুর সহ তাদের বাসায় সকালের নাস্তা করলাম । চাচা জিজ্ঞেস করলেন –তুমি ক্যান্টনমেন্টে যাবে কিভাবে? আমি বললাম-আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সে সামরিক আদালতে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখতে যাওয়াটা তখনকার সময়ের প্রেক্ষিতে কতবড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল , তা এখন ভাবতেই গা শিউরে উঠে । কারণ পাকিস্তানী শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা তখন অনেক বাঙালির পক্ষে সম্ভব ছিল না । আমি সৌভাগ্যবান এডভোকেট মশিউর চাচার বদান্যতায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল । সামরিক আদালতের সেদিনের পাসটি আমার কাছে কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো সংরক্ষিত আছে।

বঙ্গবন্ধুর নামকরণ:
বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের ইতিহাসে একাত্ম হয়ে আছেন । এরই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিব কিভাবে বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হলেন সেটিও একটি ইতিহাস। বাংলায় বঙ্গবন্ধু নামটি তাত্পর্যবহ। বাংলা ভাষাগত জাতীয়তার মাধ্যমে যে একটি জাতি একত্রিত হচ্ছে তার একটি প্রমাণ এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বটে । ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই । এখানে আমার সাথে পরিচয় হয় বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্য পুত্র ছাত্রলীগ নেতা শেখ কামালের সাথে । আমরা দু্জন একই ক্লাসে পড়ি, সহপাঠী। কিন্তু সহপাঠীর পরিচয় ছাপিয়ে আমরা দুজনে পরিণত হই অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে । আমাদের বন্ধুত্বের এই সুত্রপাত ঘঠিয়ে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা জননেতা এম এ আজিজ। ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা শুনে এক এ আজিজ আমাকে বললেন, ঐখানে মুজিব ভাইয়ের ছেলে শেখ কামাল পড়ে, তোমাকে পেলে ও খুব খুশি হবে, তোমাকে ওর দরকার । একথা বলে এম এ আজিজ একটি চিরকুট লিখে দিলেন শেখ কামালের কাছে । চিরকুটটি পেয়ে শেখ কামাল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন যেন কতদিনের পুরানো বন্ধুকে তিনি খুঁজে পেলেন । আমাদের দুজনের মধ্যে তত্কালীন ছাত্র রাজনীতির নানা বিষয়ে কথা হতো বিশেষত: ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে কিভাবে সংগঠিত করা যায় । এক পর্যায়ে আমাকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও করা হয় । ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে তত্কালীন ছাত্র আন্দোলনের খবরাখবর প্রকাশ , বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষে আমি শেখ কামালকে একটি বুলেটিন প্রকাশ করার প্রস্তাব করি। আমার প্রস্তাবমতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার মুখপত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি‘ প্রকাশিত হয়। তখনও শেখ মুজিবের নামের সাথে সুনির্দিষ্ট কোন বিশেষণ যুক্ত হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন নামকরণ হলেও কোনটি তেমন স্বীকৃতি লাভ করেনি । শেখ মুজিবুর রহমান তখনও বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত হননি, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাঁকে মুজিব ভাই নামে সম্বোধন করতেন। ১৯৬৬ সাল থেকে তরুণ সমাজ তাঁর নামের আগে সিংহশার্দুল,বঙ্গশার্দুল ইত্যাদি খেতাব জুড়ে দিত। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবের নামের সাথে একটি যথাযথ বিশেষণ যুক্ত করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে দীর্ঘদিন ধরে । দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতা উল্লেখ করে ৩ নভেম্বর ১৯৬৮ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার প্যাডে সারথী ছদ্ম নামে ‘আজব দেশ‘ শিরোনামে আমি একটি নিবন্ধ রচনা করি।
৬দফার আলোকে লিখিত এই নিবন্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অসারতার যুক্তি তুলে ধরার পাশাপাশি গণমানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের নামের সাথে প্রচলিত বিভিন্ন বিশেষণের সাথে সর্বপ্রথম ‘‘বঙ্গবন্ধু‘‘ বিশেষণটি ব্যবহার করি। আমার ইচ্ছা ছিল এই নিবন্ধটি আমাদের বুলেটিন প্রতিধ্বনিতে প্রকাশ করতে । কিন্তু সিরাজুল আলম খান সহ ছাত্রলীগের তত্কালীন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাকে ওই মুহুর্তে নিবন্ধটি না ছাপানোর পরামর্শ দেন । তাঁদের যুক্তি ছিল, এই নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের ধারাবাহিক কার্যক্রম পুলিশী রোষানলে পড়বে একই সাথে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার কার্যক্রম পরিচালনাও ব্যাহত হবে।
‘আজব দেশ‘ নামে এই লেখায় ‘বঙ্গবন্ধু‘ বিশেষণটি আমার কাছে খুব যুত্সই এবং যথার্থ মনে হওয়ায় ‘বঙ্গবন্ধু‘ শব্দটি অন্য কোথাও ছাপার চিন্তা করলাম । ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে প্রতিধ্বনি বুলেটিনে ঐতিহাসিক ৬দফা পুণর্মূদ্রণের সময় সর্বপ্রথম ‘বঙ্গবন্ধু‘ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন প্রচারপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু‘ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে ।১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতারুপে আত্মপ্রকাশ করেন। ৬৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানের গণ সংবর্ধনায় তোফায়েল আহমদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভুষিত হওয়ার পর থেকেই শেখ মুজিবের নামের সাথে এতদিনের প্রচলিত মুজিব ভাই, বঙ্গশার্দুল, সিংহশার্দুল ইত্যাদি বিশেষণকে রীতিমত চিরবিদায় দিয়ে বঙ্গবন্ধু নামটিই সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু নামটি পরবর্তীকালে তাঁর নামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে । এখন বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করলে আর শেখ মুজিব বলতে হয়না । একই ভাবে শেখ মুজিব নাম উচ্চারিত হলেই বঙ্গবন্ধু উপাধিটিও চলে আসে অনিবার্যভাবে । তাই আজ বঙ্গবন্ধু মানে ‘শেখ মুজিবুর রহমান‘, শেখ মুজিবুর রহমান মানেই ‘বঙ্গবন্ধু‘।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ:

গত শতাব্দীতে পূর্ব বাংলার উপর শাসন-শোষণ বঞ্চনা যত দ্রুত প্রকট হতে থাকে শেখ মুজিবও তত দ্রুত বদলে গিয়ে সক্রিয়তাবাদী নেতা থেকে পরিণত হন বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয় নেতায় । বিশেষত ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের পর তিনি হয়ে উঠেন বাংলার জনগণের অধিনায়ক-বঙ্গবন্ধু ।
বঙ্গবন্ধু নামকরণ করার পাশাপাশি আমার উদ্যোগে ছাত্রলীগের ধীমান কর্মী রায়হান ফিরদাউস মধু এবং বদিউল আলমের সহযোগিতায় ১৯৭০ সালে ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর জীবনী ভিত্তিক দেড় ফর্মার একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম , যার শিরোনাম ছিলো ‘এই দেশেতে জন্ম আমার‘ । বইটির প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন প্রয়াত অংকন শিল্পী কালাম মাহমুদ।
তত্কালীন মতিঝিল এর ইসলাম চেম্বারের সামনে কোঅপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রেস থেকে পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছিল । বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য এই পুস্তিকাটিই বঙ্গবন্ধুর জীবনী বিষয়ক সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত পুস্তিকা । এই পুস্তিকাটি ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারের বাড়িতে গিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর হাতে দিলাম তখন তিনি খুশীতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন । আমাকে অনেক্ষণ আদর করলেন । বঙ্গবন্ধু আবেগ আপ্লুত হয়ে আমাকে বললেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা এত সুন্দর প্রকাশনা বের করতে পারে আমার ধারণাই ছিলনা । তিনি আরো বললেন, এটা প্রকাশ করতে তোর অনেক টাকা খরচ হয়েছে । তখন আমি ছিলাম নিরুত্তর । এরপর বঙ্গবন্ধু পাঁচশত টা্কার একটি নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটি তোর কাছে রাখ ।
আমার মতো ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী যাদের বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল , তারা জানেন বঙ্গবন্ধু কতো বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন।

ছাত্রলীগের ছেলেদের তিনি কিভাবে ভালোবাসতেন । দেশপ্রেমের বীজ তিনি ছাত্রজনতার হৃদয়ে কিভাবে বুনে দিয়েছিলেন , সেই ছাত্রজনতাই বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী আহবানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । দীর্ঘ নয় মাস এদেশের কৃষক , শ্রমিক, ছাত্রজনতা মরণপণ যুদ্ধ করে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে , পৃথিবীর মানচিত্রে উদিত হয় সবুজের মানচিত্র। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম ইতিহাস আমরা কেমন দুর্ভাগা জাতি স্বাধীনতার মাত্র কয়েকবছরের মাথায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি , বাঙ্গালি জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা নানা ষড়যন্ত্র করেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাহস করতে পারেনি, অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশের স্থপতিকে এদেশের দুর্বৃত্তরা হত্যা করে ইতিহাসের কলংকজনক অধ্যায়ের অবতারণা করেছিল। সেদিন দুর্বৃত্তরা মনে করেছিল জাতির জনককে হত্যা করে, তাঁর নাম নিশানা মুছে ফেলে, ইনডেমিনিটি অধ্যাদেশ জারি করে , বাংলাদেশকে অকার্যকর দেশে পরিণত করে তারা পার পেয়ে যাবে। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের মনোবাসনা পুরণ করেনি । জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু আজ অনেক বেশী শক্তিশালী। সবার হৃদয়ের মণিকোটায় আজ স্থান করে নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু, তা থাকবে আজীবন। বঙ্গবন্ধুর ৪২তম
শাহাদাত বার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মী

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.