পান্থজন জাহাঙ্গীরের গল্প || মন্দবাসা-ভালোবাসা


শহরে তখন তুমুল বৃষ্টি। জলাবদ্ধতায় প্রায় অর্ধেক শহর ডুবে গেল। অফিস ছুটির পর আমি আমার ঈশ্বর কে ডাকতে লাগলাম যাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে পারি। প্রথমে আমার পা ডুবল। এরপর হাঁটু তারপর হাঁটু থেকে বুক পর্যন্ত এরপর আর কিছু বাকি রইলনা। বড় কথা হচ্ছে আমি সাঁতার জানিনা। তাই হাটুঁপানিতেও আমার মৃত্যুভয়। এরপরও বাসা অভিমুখী অগণিত পথিকের ভিড়ে আমিও জলজটে প্রায় তিন ঘন্টা লড়লাম। কিন্তু ত্রিশগজও হয়তো এগুতে পারিনি সেদিন। ধীরে ধীরে আমার শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে আসছিল। সবাই আপন প্রাণ নিয়ে চিন্তা করছে। সুতরাং আমাকে কে বাঁচাবে। আমার মনে হচ্ছিল আর কিছুক্ষণ পরে আমি মরে যাব। আমি আমার ঈশ্বর বুদ্ধকে স্মরণ করলাম। প্রচন্ড স্রোতে আমি গায়ের উড়না খুলে দিলাম। মনে হচ্ছিল সমস্ত গায়ের কাপড় খুলে আমি পানিতে ভাসিয়ে দিই। কিন্তু আমি পারিনি। কারণ আমি মেয়ে মানুষ। তাও আবার যুবতি মেয়ে। অনেক পুরুষ এভাবে কাপড় চোপড় খুলে আন্ডাওয়ার মাথায় পরে স্রোতের প্রতিকূলে সবেগে যাচ্ছিল। কিন্তু এই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাতে আমি কি সামনে যাবো না পেছনে যাবো তা দিশকুল পাচ্ছিলাম না। একি মরণবন্যা শহরে! কিছুক্ষণপর আমার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। আমি দেখলাম ঠান্ডায় আমার স্তনদুটো আইসক্রিমের মতো জমে গেছে। আমি একটু নিচের দিকে তাকাতেই পড়ে গেলাম। এরপর আমার আরকিছুই মনে নেই। বাসায় গরম পানির সেকের পর যখন হুশ ফিরল তখন দেখলাম আমি বুদ্ধমূর্তির সামনে। মা বু্দ্ধের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে উচ্চাণ করল্ “বুদ্ধং স্মরণাঙ্গ স্বামী…..।”

আমি তাড়াতাড়ি শোয়া থেকে উঠে পড়লাম। এই ইমারতের শহরে আমার বাসায় শুধু দুটো কামরা। একটাতে মা বুদ্ধকে রেখেছেন। অন্যটাতে আমি আর মা থাকি। সুতরাং আমি তার সামনেই আমার ভেজা কাপড়গুলো আমি চেঞ্জ করি। আমি তাকে কিভাবে বলি বাইরে যেতে। এমনকি কাপড়গুলো চেঞ্জ করার সময় আমি একবারও তার দিকে তাকাইনি। যেটা সচরাচর মেয়েরা তার স্বামির সামনেও করে। সুতরাং এতবড় অকৃতজ্ঞ আমি কেমনে হই। মা প্রার্থনা শেষে আমরা তিনজনে চৌকির উপর একসাথে বসি। মা গরম চা এবং মুড়ি ভেজে দিলেন। সে খেতে সংকোচবোধ করল। হ্যাঁ তার কথাই বলছি। যে আমাকে ভেসে যাওয়া বন্যার পানি থেকে তুলে এনে মায়ের কুলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার নাম আব্দেল করিম লিটন । ভাগ্যিস আই ডি কার্ডের অপজিটে মায়ের নম্বরটা ছিল। পরের দিন আমার অফিসের অনেকে আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করে গেল।


লিটন তখন একটা গার্মেন্টসের সুপারভাইজার। জাতে সে মুসলিম। একসময় আমি তাকে ভালবেসে ফেলি। তবে এই ভালবাসাটা একতরফা নয়। প্রথমে সে আমাকে প্রেম নিবেদন করে চাকরি বাকরি ছেড়ে আমার পিছু নেই। কখন আমার ছুটি হবে তার জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতো। আমাকে সাথে করে নিয়ে আসতো। আসার পথে আইসক্রিম, ফালুদা, ফুচকা, চটপটি ইত্যাদির দোকানে আড্ড চলতো। ছুটির দিনগুলোতে শহরের ভালো ভালো বিনোদন স্পটগুলোতে আমরা বেড়াতাম। এভাবে আমাদের মধ্যে প্রেম গভীর হলো। আমরা পরস্পর প্রেমের এত হাবুডুবু খাচ্ছিলাম যে নিজেদের জাত ধর্মের কথা পর্যন্ত ভুলে গেলাম। আমরা দুজন দুজনে এত ভালবাসতাম যে নিজেদেরকে লাইলী- মজনু ভাবলেও ভুল হবে না। এক সময় সে আমাকে সাঁতারও শেখালো। এরপর থেকে আমরা বৃষ্টিতে প্রচুর ভিজেছি এবং সমুদ্র স্নান করেছিি। অবশেষে আমার মায়ের পীড়াপিড়িতে আমরা বিয়ে করলাম। বিয়ের পর আমরা চার বছর পর্যন্ত সংসার করলাম। কিন্তু এর মাঝেই আমাদের মধ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন আসলো। আর তা হচ্ছে জাত ধর্ম নিয়ে। কারণ এর মধ্যে আমাদের কোল জুড়ে আসল একটি কন্যা সন্তান। লিটন তার নাম রাখল অপি করিম। তবে এতে আমার কোন আপত্তি ছিল না। যতসব আপত্তি ছিল আমার মায়ের। কারণ আমার মা সবসময় চাইতো তাকে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে। আমি বুঝতাম তার কাছে তা ভালো লাগত না। মা তাকে ডাকো লিটন বড়ুয়া আর নাতনী কে ডাকতো অপি বড়ুয়া। তার এ বাড়াবাড়ির ফলে নামাজ দোয়া রোজা ইত্যাদিতে পালনে সে দ্বিধাগ্রস্থ হলো। একসময় সে আমাদের ছেড়ে পালিয়ে গেল। আজ প্রায় দশবছর। তার কোন খোঁজ নেই। মা বলছে নিজ ধর্মেে কাউকে এখন বিয়ে করতে। কিন্তু এটা তো সমাধান না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমার মেয়েটা কার পরিচয়ে বড় হবে এখন?


কোন ধর্মের লোকের কাছে আমি তাকে বিয়ে দিব? তার বাবার পরিচয় দিলে সে তো মুসলিম। তার দেহে তো মুসলিম আদম সন্তানের রক্ত আবার মায়ের পরিচয় দিলে সে বৌদ্ধ। আমি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করলে কোন একটা সমস্যার সমাধান হতো কিন্তু তাও পারছিনা তার কারণ আমার মা। সেতো তা হতে দিবেনা। আর দিলে সে কোথায় যাবে? আমি এখন শাাকের করাতেই আছি। আমি মাকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি কেন তিনি এই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিলেন। কি উদ্দেশ্য ছিল তার? তাছাড়া আমি তো তাকে কথা দিয়েছিলাম, আমি তার ধর্ম গ্রহণ করবো। কিন্তু মা কেন বাধা দিলেন জানিনা। এই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার এত দূর্বলতা কেন? তিনি কেন সামাজিক সমস্যা বাড়াচ্ছেন! মেয়েটা এখন ক্লাস এইটে পড়ছে। মা এখন একটা ক্লিনিকে আয়ার কাজ করছে। আমি পুরোদমে গৃহিনী। আর কোন উপায় নেই। কারণ আমার মেয়েটা কে দেখবে। সুতরাং আমার জীবনটা এখন তপ্ত মরভূমি। আমি বাঁচার কোনো উপদান খূঁজে পাচ্ছিনা। কোনো ধর্মের প্রতি এখন আমার বিশ্বাস নেই। আমি খুব হতাশ। একা হলে নিজেকে আমি কবেই শেষ করে দিতাম। এই ট্রাজেডিপূর্ণ জীবন আমি আর যাপন করতে পারছিনা।
এই হচ্ছে স্যার আমার জীবনের গল্প। আমি দু:খিত স্যার। প্রশ্নের উত্তরটা অনেক বড় হয়ে গেছে।
– না না কোনো অসুবিধা নেই। তবে আপনি বলছেন এখন তো কোনে ধর্মের প্রতি আপনার বিশ্বাস নেই। তাহলে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে আপনি কাকে ডাকেন?
-কাকে ডাকব? আগে তো বুদ্ধকে ডাকতাম, এরপর মাকে ডাকতাম আর এখন কাউকে ডাকি না। তবে মাঝে মাঝে এরকম পরিস্থিতিতে লিটন কেই ডাকি। কারণ সে আমাকে যতটুকু শান্তি দিয়েছে আমাকে আমার সমাজ ধর্ম বা মা কেউ দেয়নি।
-তাই?
-হ্যাঁ
– কিন্তু আপনার মেয়ে পড়াশুনায় অমনোযোগী হলেও ক্লাশে এত হাসি খুশি থাকে যে দেখলেই বুঝা যায় না আপনাদের জীবন এত দু:খময়।
– আমি তাকে বলছি কোন চিন্তা না করতে। সবকিছু ভুলে ডেস্পারেটলি জীবন যাপন করতে।
– কিন্তু চিন্তা ছাড়া তো মানুষের অস্তিত্ব নেই। বেঁচে থাকলে তো মানুষের চিন্তা করতে হয়।
– তা ঠিক। কিন্তু আমরা তো স্যার কবেই মরে গেছি।

[বি: দ্র: “গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। জীবিত, মৃত বা অর্ধমৃত কারো সাথে মিল থাকলে একান্ত কাকতালীয়]

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.