আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট : ফয়সালা আজ

আজ ৮ নভেম্বর। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সমগ্র বিশ্বের মিডিয়াচোখ আজ আমেরিকার দিকে তাক করা! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি তার আড়াইশ’ বছরের ইতিহাসে শেষপর্যন্ত এক নারীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে? নাকি নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকে নানা বিতর্কিত এবং অভিবাসী, বর্ণ ও জাতিবিদ্বেষী মন্তব্য করে আসা একজন কোনো ম্যাজিকে পাশার দান উল্টে দেবেন? এ প্রশ্নের ফয়সালা হবে আজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ভোট শুরু হবে স্থানীয় সময় সকাল ৬ টা থেকে ৭ টার মধ্যে। ১১ ঘণ্টা থেকে ১৩ ঘন্টা ভোট গ্রহণ চলবে। ১৯৪৮ সাল থেকে ঐতিহ্য অনুযায়ী নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডিক্সভিল নচ এবং হার্টস লোকেসন নামের দুটি ছোট গ্রামের অধিবাসীরা প্রথম ভোট দেবেন। এ দুই গ্রামে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই বুথ খুলে দেওয়া হবে। এই ভোটকে মধ্যরাতের ভোটও বলা হয়। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে রোববার থেকে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে বাংলাদেশে যখন বেলা ১২টা বাজবে, নিউ ইয়র্কে তখন সময় থাকবে ১১ ঘন্টা পিছিয়ে, সেখানে তখন হবে রাত ১টা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের আর্টিকেল-২ এর দ্বাদশ সংশোধনী অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথা অনুযায়ী নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরদিন মঙ্গলবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সারা বিশ্বে এ নির্বাচন নিয়ে রয়েছে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি নিয়ে কাজ করা লোকজনের বাইরে সেই উত্তেজনা খুব যে বোঝা যাচ্ছে, তা নয়। কত জন আজ ৮ নভেম্বরের হিমশীতল সকালে বা কাজ থেকে ফেরার পথে শেষ পর্যন্ত তাদের কমিউনিটি হল, প্রাইমারি স্কুল বা মিডল স্কুলের বাড়িটায় ঢুকবেন ভোটটা দিয়ে আসতে, এটা কিন্তু এবার বড় প্রশ্ন। ভোটদানের হারের উপরেই অনেক কিছু নির্ভর করে আছে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য।

মার্কিন রাজনীতিতে হিলারি পোড়খাওয়া সদস্য। দীর্ঘ আট বছর আমেরিকার ফার্স্ট লেডি ছিলেন। বিল ক্লিন্টনের সঙ্গে থেকে প্রশাসনের আনাচ-কানাচ সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এর পরে মার্কিন সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। সেই জনপ্রিয়তায় ভর করে ২০০৮-এ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে নামলেও ওবামার কাছে হেরে যান। পরে ওবামাই অবশ্য হিলারিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। এই পর্বে বিশ্ব জুড়ে কাজ করে হিলারির অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে উঠেছে। অপরদিকে, ধনকুবের ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান প্রার্থী হওয়ার জন্য দৌড় শুরু করেছিলেন তখন অনেকেই তা ঠাট্টা বলে ধরেছিলেন। কিন্তু রিপাবলিকান প্রাইমারিতে বাঘা বাঘা প্রার্থীদের পিছনে ফেলে সেই ট্রাম্পই আজ হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী। বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যেও জন্য প্রবল বির্তকের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। বিতর্ক এমনই যে, রিপাবলিকানদের একটি অংশ হিলারিকে ভোট দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। তার পরেও বিশ্লেষকরা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন।

৫৩৮টি ইলেক্টোরাল কলেজের মধ্যে যিনি ন্যূনতম ২৭০টি ভোট পাবেন, তিনিই বেসরকারিভাবে নির্বাচিত বলে ঘোষিত হবেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে তার রানিং মেট আপনা আপনিই নিবাচিত হয়েছেন বলে বিবেচিত হবেন। বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের যতো বেশী ভোটই পান না কেনো তাতে কোনো লাভ হয় না। ধরা যাক ক্যালিফোর্নিয়ায় ৯৯ শতাংশ ভোটার হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিয়েছেন, তিনি ওই রাজ্যের পুরো ৫৫টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পাবেন। যদি তিনি ওই রাজ্যের ৫১ শতাংশ ভোটও পান, তবুও তিনি ৫৫টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পাবেন।

ইলেক্টোরাল কলেজের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করা হয়ে থাকে দলীয় ভিত্তিতে।

কোন কোন রাজ্য ঐতিহাসিকভাবে প্রতি নির্বাচনেই ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই রাজ্যগুলোকেই নির্বাচনের ব্যাটলগ্রাউন্ড বা ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই অঙ্গরাজ্যগুলো এবং এর ইলেক্টরদের সংখ্যা হচ্ছে- ফ্লোরিডা (২৯), পেনসিলভেনিয়া (২০) এবং ওহাইয়ো (১৮)টি। এদের মধ্যে ওহাইও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৪ সাল থেকে এই রাজ্যের ভোটেই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্ধারিত হয়ে আসছে। ফলে ওহাইও রাজ্যের প্রতি জোর সকল দলের প্রার্থীদের।

এদিকে ভোটের একদিন আগে চালানো শেষ মুহূর্তের জরিপেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে ৪ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন । যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফক্স নিউজ এ জরিপ চালায়। জরিপ অনুসারে, হিলারি পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ ভোটারের সমর্থন আর ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন ৪৪ শতাংশ আমেরিকান।

শুরু থেকে সব জরিপেই হিলারি এগিয়ে ছিলেন চার থেকে পাঁচ শতাংশ পয়েন্টে। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তার ই-মেইল কাণ্ড নিয়ে এফবিআই নতুন করে তদন্তের ঘোষণা দিলে হিলারির জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা দেখা দেয়। তারপর জনমত জরিপগুলোতে হিলারির সঙ্গে ব্যবধান কমতে শুরু করে ট্রাম্পের। রোববার এফবিআই জানায়, ই-মেইলগুলোর মধ্যে কোনও ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তে এই নাটকীয় ঘটনায় হিলারির প্রচারণা শিবিরের ওপরে ছায়া ফেলা মেঘ সরে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ইস্যুটির সমাধান হওয়ায় নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে হিলারির প্রচারণা শিবির। অপরদিকে ট্রাম্প বলেছেন, এত অল্প সময়ে কথিত ছয় লাখ ৫০ হাজার ইমেইল পরীক্ষা করা এফবিআইয়ের পক্ষে অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘কারচুপির একটি পদ্ধতিতেই তাকে এখন রক্ষা করা হচ্ছে। পুরো পদ্ধতিটাই কারচুপিতে পূর্ণ। আমি অনেকদিন ধরেই এ কথা বলে আসছি। হিলারি ক্লিনটন দোষী, তিনি নিজেও তা জানেন, এফবিআই তা জানে, জনগণও এটা জানে। এখন ৮ নভেম্বর ব্যালট বাক্সে ন্যায়বিচার করার বিষয়টি আমেরিকার জনগণের ওপরই নিভর্র করছে।’

প্রচারের শেষ দিনে গত রোববার সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে ছুটে বেড়িয়েছেন হিলারি ও ট্রাম্প দু’জনই। শেষ মুহূর্তের সমাবেশে আজকের নির্বাচনকে ‘ইতিহাসের মোড়ক’ এবং ‘হিসাব-নিকাশের মুহূর্ত’ বলে বর্ণনা করেন হিলারি। তিনি বলেন, ‘আমেরিকান হিসেবে এটি আমাদের মূল্যবোধের পরীক্ষা হবে।’ জনতার উদ্দেশে হিলারি বলেন, আমি আপনাদের স্বপ্ন কী তা জানি না, জানি না আপনাদের সংগ্রামের কথা। কিন্তু এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে চাই যে, আমি আপনাদের পক্ষেই থাকবো, আপনাদের জন্য লড়াই করবো, আপনাদের পরিবারের জন্য লড়াই করবো, আপনাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করবো। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমার লক্ষ্য আমার প্রতিপক্ষের চেয়ে ভিন্ন, তিনি প্রত্যেকটা মানুষকে-আমাকে কীভাবে অপমান করেছেন সেটা সবাই দেখেছে-জ?ানে, তিনি গোটা আমেরিকায় কেবল অন্ধকার দেখেন, কিন্তু আমি যে আমেরিকা ঘুরেছি, তাতে কেবল আশার আলো দেখি। আমার লক্ষ্য আশাবাদী, নির্ভুল এবং সংঘবদ্ধ আমেরিকা গড়তে কাজ করা, যেন আমেরিকা তার শ্রেষ্ঠত্বের জায়গায়ই থাকতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেকে একটি ভাঙা দেশ জোড়া লাগানোর ‘শেষ সুযোগ’ বলে বর্ণনা করেছেন। মিনেপোলিস উপকণ্ঠে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, সোমালিয়া থেকে আসা শরণার্থী জনগোষ্ঠী ওই এলাকার জন্য ‘দুর্যোগে’ পরিণত হয়েছে।

শেষপর্যন্ত কে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবে তার ফয়সালা আগামীকাল মিলতে পারে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.