স্কুলে যাবার বয়সে রিকশা চালায় এতিম শিশু ইলিয়াস!

আবীর চৌধুরী: ইলিয়াসের বয়স মাত্র এগার। এই বয়সে যাবার কথা বিদ্যালয়ে। হাতে থাকার কথা বই-খাতা-কলম। কিন্তু মা-বাবা বেঁচে না থাকায় পেটের দায়ে চালাতে হচ্ছে রিকশা। রিকশাচালনায় অনভিজ্ঞতার কারণেও থাকছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

ছোট্ট রিকশাচালক ইলিয়াসকে এই শীলকূপ মনছুরিয়া বাজার এলাকায় সবাই এক নামে চেনে। কারণ এ বয়সের রিকশাচালক এই এলাকায় নেই।
ইলিয়াসের বাড়ি শীলকূপ ইউনিয়নের পূর্ব দিকে আদর্শ গ্রামে পাহাড়ি এলাকায়। তাদের নিজ বাড়ি চাম্বল ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায়। কিন্তু তার বাবা-মা মারা যাবার পরপরই এই এলাকায় এসে থাকছে তারা।

তার সাথে আর কারা থাকে জিজ্ঞেস করলে ইলিয়াস উত্তরে বলে ‘শীলকূপ ইউনিয়নের পাহাড়ে আদর্শ গ্রামে ছোট ভাই মো. ইদ্রিস (৮) আর বৃদ্ধ দাদাকে নিয়ে থাকে সে। বড় দুই বোন রুমা আক্তার (১৫) ও রুজিনা আক্তার (১৩) চট্টগ্রাম শহরের দুই নম্বর গেট এলাকায় আলাদা বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে কাজ করে।’
কৌতূহলী মনে বললাম ‘তোর বাড়িতে যাব চল।’ ইলিয়াস বলল ‘আপনাকে নিয়ে গেলে সারাদিন নষ্ট হবে। টাকা না পেলে খাব কি?’ বললাম ‘আমি ভাড়া দিয়ে যাব।’ ‘ভাড়া পাবে আশ্বস্ত হয়ে তার বাড়ির দিকে নিয়ে চলল আমাকে।‘
শীলকূপ ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকার ভেতর দিয়ে অনেক দূর হেটে তার বাড়িতে পৌঁছাতেই দেখা মিলল তার মামা মনজুর আলমের সাথে। ইলিয়াসের কুঁড়েঘরে তার দাদাকে দেখতে গিয়েছিল মনজুর আলম। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘ইলিয়াসের বাবা-মা মারা গেল কিভাবে?’
উত্তরে ইলিয়াসের মামা বলল, ‘২০১২ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয় তার বোন রেহানা আক্তার। ঐদিন তাকে বাঁশখালী উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। সে দিনই তার মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যু শোক সইতে না পেরে আধ ঘন্টার ব্যবধানে মারা যান বোনের স্বামী জহিরুল ইসলাম। তখন থেকে ইলিয়াসরা এতিম। ২০১৭ সালের ৩ জুন তার দাদী খতিজা বেগম (৬০) মারা যান। বৃদ্ধ দাদা নুরুল কবির (৭০) এবং ছোট ভাই মো. ইদ্রিস (৮) কে নিয়ে কোন রকমে বেঁচে আছে তার ভাগিনা ইলিয়াস (১১)। পাহাড়ি এলাকায় অস্থায়ী কুঁড়েঘরে করে বাস করছে ইলিয়াস। ভাগিনী রুমা আক্তার (১৫), রুজিনা আক্তার (১৩) চট্টগ্রাম শহরের দুই নম্বর গেট এলাকায় বুয়ার কাজ করে কোন রকমে দিন কাটাচ্ছে।’
ইলিয়াসের মামা মনজুর আলম আরো বলেন ‘তিনিও আর্থিক ভাবে অসচ্ছল। তাই মৃত বোনের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে পারছেন না। ভাড়া করা একটি রিকশা চালিয়ে কোন রকমে পেটে ভাতে চলছে ইলিয়াস। দুই ভাগিনীর বিয়ে দেবার সময়ও চলে আসছে। কি হবে বুঝতে পারছিনা। এলাকার বিত্তশালীদের কেউ এগিয়ে আসলে পরিবারটির কোন গতি হত বলছিলেন ইলিয়াসের মামা।’
রিকশা চালাতে কেমন লাগে জিজ্ঞেস করলে ছোট্ট ইলিয়াস উত্তরে বলে, ‘রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হয় তার। কিন্তু অন্যকোন উপায়ও নেই। তাকে সাহায্য করতে তেমন কেউ এগিয়েও আসেনি।’ হাসতে হাসতে বলছিল ছোট্ট ইলিয়াস।’
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল হোসেন এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ইলিয়াসের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির বয়স নেই। কিন্তু তার ছোট ভাই ইদ্রিসকে শীলকূপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে বলেন। ভর্তির পর প্রাথমিক শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করবেন। ইলিয়াস এবং তার বোনদের সহায়তা করতে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক কার্যালয়ে এ ব্যাপারে কথা বলার পরামর্শ দেন।’

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.