সালসাবিলা নকির গল্প || একটি ভয়ংকর রাত অথবা অসম্পূর্ণ গল্প

একটি ভয়ংকর রাত অথবা অসম্পূর্ণ গল্প

সালসাবিলা নকি

রাত দশটা ৷ টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে সায়রা ৷ স্বপন এখনো ফেরেনি ৷ আজকাল প্রায় অনেকরাত করে সে বাসায় ফিরছে ৷ খুব চিন্তিত থাকে সবসময় ৷ কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে দেশের অবস্থা ভালো না, দেশের অবস্থা খুব খারাপ ৷ এভাবে বললে কি কিছু বোঝা যায় ৷ আজ আসুক তখন ওর পেট থেকে যে করেই হোক সব কথা বের করবে ৷

রাত ১২.০৩৷ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ৷ ঘুম ঘুম চোখে সায়রা দরজা খুলল ৷ খুব বিষন্নমুখে ঘরে ঢুকল স্বপন ৷
-আজ তো অনেক বেশি দেরি করে ফেললে
-হুম, খেয়েছো?
-বিয়ের পর থেকে তোমাকে ছাড়া খেয়েছি কখনো? হাতমুখ ধুয়ে এসো, আমি খাবার গরম করে আনছি৷
.
খাবার টেবিলে বসে স্বপন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে আর সায়রা গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে৷ আজকাল স্বপন কেমন যেন হয়ে গেছে৷ খুব কম কথা বলে৷ দেখলে মনে হয় খুব কঠিন কোন সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবছে৷ সায়রার অসহ্য লাগে স্বপনের এই আকস্মিক পরিবর্তন৷ আগে কি কথায়ই না বলত সে, সায়রাও বিরক্ত হয়ে বলতো “দু মিনিট কি চুপ করে থাকা যায়না? এতো কথা ক্যামনে বলো, মুখ ব্যথা করে না তোমার?” স্বপন হাসি লুকিয়ে বলতো “কথা না বললে তো হৃদয় ব্যথা হয়ে যাবে৷” সেই স্বপন এখন কিভাবে কথা না বলে হৃদয়ে ব্যথা চেপে আছে! সায়রা নীরবতা ভাঙল,
-মাছ কেমন হয়েছে?
-হুম, ভালো।
সায়রার চোখ ছলছল করে উঠল৷
+আমি তো মাছ রাঁধিনি।
.
কথাটা শুনে চমকে উঠল স্বপন। খাওয়া বন্ধ করে সায়রার দিকে তাকালো৷ সায়রার চোখে পানি দেখে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইল। সায়রা স্বপনের গালে হাত বুলিয়ে বলল,
-তোমার কী হয়েছে বলো তো? কী কারণে তোমার এতো মন খারাপ থাকে? আগে তো একটু কিছু হলেই আমার সাথে শেয়ার করতে৷
-দেশের অবস্থা ভালো না সায়রা।
-শুধু ঐ একই কথা দেশের অবস্থা ভালো না ৷ কী হয়েছে তাতো বলো না।
-তুমি বুঝবে না।
-কেনো বুঝব না? বল কেন বুঝব না আমি? বুঝিয়ে বললেও বুঝব না? তুমি বুঝিয়ে বলেছ আমাকে?
.
সায়রা অঝরে কাঁদছে। স্বপন নির্বিকার৷ চোখ মুছে সায়রা বলল,
-প্লিজ আমাকে সব খুলে বলো। আমি তোমার মন ভালো করে দিতে পারব। আমার কাছে এমন একটা খবর আছে যা শুনলে তুমি খুশিতে পাগল হয়ে যাবে, তোমার সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে।
-এ জন্যই বলি তুমি বুঝবে না। আমি একা খুশি থাকলে তো চলবে না, এটা আমার একার দুঃখ না, আমার একার চিন্তার বিষয় না, পুরো দেশের স্বার্থ জড়িত। আগে তুমি শান্ত হয়ে বসো আমি সব বলছি।
.
একটু থেমে স্বপন বলা শুরু করল,
তুমি তো জানো পাকিস্তানীরা আমাদের দেশের মানুষকে শোষণ করে চলেছে বহুবছর ধরে। তারা অর্থনৈতিকভাবে আমাদের তো পঙ্গুই করে দিয়েছে। ৫২ তে আমাদের ভাষার উপরেও কুনজর দিয়েছিল। এখন আরো অত্যাচারী হয়ে উঠেছে।
-কী হয়েছে এখন?
-কয়েকদিন ধরে আমার ফিরতে দেরী হচ্ছে কারণ জসিম ভাই, কাদের ভাই, সিদ্দীক ভাই, আশরাফ, লিটন ওদের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করি। ওরা সবাই তো ছাত্র রাজনীতি করে। ওদের কাছ থেকে অনেক খবরাখবর পাই। ওরা বলছে পাকিস্তানীরা কোন গোপন ষড়যন্ত্র করতে পারে। কারণ ওরা এতো সহজে আমাদের স্বাধীনতা মেনে নিতে চাইবে না ৷
-স্বাধীনতা!
-হ্যা সায়রা স্বাধীনতা। আমরা চাই স্বাধীনভাবে থাকতে। আমরা কেন ওদের গোলামী করব? ওরা আমাদের বন্ধু হতে পারে কিন্তু ওরা চায় আমাদের প্রভু হতে। এটা কি মেনে যায়?
-কিন্তু আমরা কীইবা করতে পারি? তুমি বলছ ওরা সহজে আমাদের স্বাধীনতা মেনে নিবে না৷ যদি এমন হয় তাহলে আমরা কী করব?
-এটা নিয়েই তো যত দুশ্চিন্তা। দেখা যাক কী করে ওরা, সময়ই বলে দিবে আমাদের কী করতে হবে ৷
.
দুজন কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল৷ তারপর স্বপন ঘুমাতে গেল৷ সায়রাও খাবার টেবিল গুছিয়ে রুমে ঢুকল। ঘুমন্ত স্বপনের মুখের দিকে চোখ পড়তেই মনে পড়ে গেল ওকে খুশির খবরটা দেয়া হয়নি ৷ ইশ! আজ যদি প্রথমেই কথাটা বলত তাহলে স্বপন খুউব খুশি হতো৷ প্রথম বাবা হওয়ার খুশি তো সবচেয়ে আলাদা। কিন্তু সায়রা নিজেই তো কান্নাকাটি করে সব ভুলে গেছে। কাল সকালেই গুড নিউজটা দিবে। স্বপন শুনে কী করবে? হয়তো আনন্দে কেঁদে ফেলবে। ওরা দুজনেই ছিঁচকাঁদুনে। অল্পতেই চোখে পানি চলে আসে। ওদের বাচ্চাও হয়তো এমনই হবে। আচ্ছা ওদের বাচ্চা দেখতে কার মত হবে? ওর মত নাকি স্বপনের মতো? নাকটা স্বপনের মতো আর চোখ ওর নিজের মতো হলে খুব ভালো হবে৷ আচ্ছা নাম কী রাখবে? ছেলে হলে স্বাধীন আর মেয়ে হলে স্বাধীনতা! হুম, কাল সকালেই স্বপনকে বলবে। ওর নিশ্চয়ই নামদুটো পছন্দ হবে৷ এসব ভাবতে ভাবতে সায়রাও একসময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল।
.
রাত ২.৫০৷ দরজা খুব জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে কেউ। ধরফর করে বিছানায় উঠে বসল সায়রা। স্বপন তখনো পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
-এই এই উঠো
-হু…
-উঠো না। কে যেন দরজায় নক করছে। প্লিজ উঠো আমার ভয় করছে খুব। মনে হচ্ছে দরজাটাই ভেঙে ফেলবে।
-উফ, কে এলো আবার?
স্বপন বিরক্ত হয়ে উঠে দরজা খুলতে গেল। দরজা খোলার সাথে সাথেই এক ঝলক আলো দেখা গেল, অনেকগুলো গুলির শব্দ আর একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল৷ সায়রা দৌড়ে গেল দেখতে৷ কিছু বুঝে উঠার আগেই আবারো সেই চোখ ধাঁধানো আলো আর গুলির শব্দ৷ সায়রা অবাক হয়ে দেখল ওর বুক ভিজে যাচ্ছে লাল রক্তে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে পেটের ওপর। যেখানে ছোট্ট একটা স্বাধীন বা স্বাধীনতা পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় আছে।
.
সামনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ৷ আরও অনেকগুলো এলোপাথারি গুলি করে ওরা বেরিয়ে গেল। সায়রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, স্বপনের ঠিক পাশেই। স্বপনের চোখ খোলা, দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে। সায়রা হাত দিয়ে ওর চোখের পাতা বন্ধ করে দিল আর ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল “সরি প্রিয়, তোমাকে সবচেয়ে খুশির খবরটা দিতে পারিনি। জানতাম না তো এভাবে আমাদের চলে যেতে হবে। আমাকে ক্ষমা করা দিও।” সায়রার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। পুরোপুরি চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে প্রাণ ভরে স্বপনকে দেখে নিল। তারপর ওর গালে আলতো করে চুমু এঁকে সায়রা চিরতরের জন্যে ঘুমিয়ে পড়ল। রেখে গেল একবুক আক্ষেপ! এ দেশে স্বাধীন বা স্বাধীনতার জন্ম দিয়ে যেতে পারেনি সে…

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.