BanshkhaliTimes

শঙ্খ: ভাঙনের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন গ্রাম!

মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী টাইমস: শঙ্খ নদীর ভাঙ্গন যেন কোন কিছুতেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না । একদিকে ভাঙ্গন বন্ধ করলে শুরু অন্যদিকে। ভাঙ্গনের তালিকায় যোগ হয় নতুন নতুন নাম।

বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড়ের রাতাখোর্দ্দ জলদাশ পাড়া ও কৈর্তব পাড়ার অর্ধ শতাধিক বাড়িঘর, মাদ্রাসা, রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি, মৎস্য পুকুর, মসজিদ, গরু-হাঁস মুরগীর খামার নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত দু’সপ্তাহ টানা বর্ষণে শঙ্খ নদীর পানির স্রোতে অর্ধশতাধিক পাকা দালান, বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে অর্ধ শতাধিক পরিবার। আশ্রয়হীন পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে শঙ্খ নদীর বাঁধের উপর, রাস্তার ধারে, আত্বীয়-স্বজনের বাড়িতে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো সহস্রাধিক পরিবার। যে কোন সময় নদীগর্ভে বিলীনহতে পারে ভাঙনের মুখে থাকা বাড়িঘর।যেখান কার জনগনের একমাত্র পেশা সাগরে মাছ ধরা । জেলে সম্প্রদায় হওয়াতে তাদের প্রতি নেই কারো নজরদারি । ফলে এ এলাকার কয়েকশ পরিবার শঙ্খ নদীর ভাঙ্গন এর কবলে পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে ।
শুক্রবার (২২ জুন) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রমত্ত শঙ্খ নদীর স্রোতের তোড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সাধনপুর,খানখানাবাদ ও পুকুরিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। দীর্ঘ বছর ধরে নদীভাঙনের সৃষ্টি হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন প্রতিরোধে পরিকল্পিত কোন উদ্যোগ না নেয়ায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে।

জেলেপাড়া সংলগ্ন এক সময়ের নামকরা বাজার ঈশ্বরবাবুর হাট । যেখানে একসময় কয়েকশ দোকানপাট থাকলে ও বর্তমানে হাতেগুনা কয়েকটা দোকান রয়েছে মাত্র।জেলেপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলকদর খালটি একসময় ব্যবসায়ীদের মালামাল আনা নেওয়ার অন্যতম যাতায়াত মাধ্যম ।খালের পশ্চিম পার্শ্বে খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া রায়ছটা পূর্বপার্শ্বে সাধনপুর ইউনিয়নের জেলেপাড়া,কৈবত্য পাড়া,রাতাখোর্দ্দ সহ অন্যাণ্য পাড়া গুলো অবস্থিত। বর্তমানে প্রতিদিন জেলেপাড়া,কৈর্বত্য পাড়ার বাড়িঘর গুলো শঙ্খের ভাঙ্গনের শিকার হয়ে একে একে বিলীন হতে বসেছে ।

ইতিপূর্বে রার্তার কূল সার্বজনীন রক্ষা কালী মন্দির টি প্রায় ৪ বার এই সাঙ্গুর থাবায় ভেঙ্গে যায়।একই সাথে খানখানাবাদ ইউপির রায়ছটা পোষ্ট অফিস কার্যালয়টি সাঙ্গুতে পড়ে গেছে। গত মঙ্গলবার (১৯ জুন) গভীর রাত থেকে পানির তীব্র আক্রমনে ২৫ টির ও অধিক ঘর বাড়ি বিলীন হয়ে যায়।তাদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঘর বাড়ি ভেঙ্গে চুড়ে বিলীন হয়ে যাওয়া স্হানীয় মৃত পুষ্প পদ দাশের পুত্র বাহাদুর দাশ (৪৮) এর পরিবার,মৃত অনিল দাশের পুত্র শরজীদ দাশ (৩২),গোপালী দাশের পুত্র সাধু দাশ(২৮),মৃত সত্যরঞ্জন দাশের পুত্র বাবুল দাশ(৫০),মৃত পেটান চন্দ্র দাশের পুত্র মতি লাল দাশ(৫০),মৃত হাসী রাম দাশের পুত্র সর্ত্য দাশ (৩৪),জয়রাম দাশের পুত্র সুজন দাশ (৩৫),মৃত বিজয় দাশের পুত্র শমীর দাশ (৩৬),সচীন্দ্র দাশের পুত্র জয় লাল দাশ(৪০),মৃত উফেন্দ্র দাশের পুত্র শ্রীরাম দাশ (৪২),মৃত রায় চন্দ্র দাশের পুত্র জয়রাম দাশ (৫৫),মৃত রাম প্রসাদ পুত্র বিমল দাশ (৩০),মৃত বরনী দাশের পুত্র শ্রীদাশ (৬০),ইন্দ্র সেনের পুত্র সুর্য সেন (৬০),গোপালের পুত্র মধু(৩৪),শ্রীদাশের পুত্র শুভ দাশ (২৮),মৃত দক্ষিনা রঞ্জন দাশের পুত্র মনদোলা দাশ (৩২),হিমাংশু জলদাশের পুত্র উদ্ভাব জলদাশ (৩৬),মৃত কাশিরাম দাশের পুত্র অরি রঞ্জন দাশ (২৪),দূর্গা চরন দাশের পুত্র সুনীল দাশ (৫৫),শমর শর্মার পুত্র সুভ্রত শর্মা (২৪),মৃত অহি রঞ্জন দাশের পুত্র খোকন দাশ (৩৫) ঘর বাড়ি হারিয়ে বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে জিবন যাপন করছেন।
পাশাপাশি আরো অর্ধশতাধিক বাড়ি বিলীন হবার পথে। জেলে সমপ্রদায়ের লোকজন জানে না কোথায় গেলে তাদের বাড়ি ঘর রক্ষা করার মত উপায় খুঁজে পাবে ।তাই নিরুপায় হয়ে সাগর পানে চেয়ে চেয়ে দিন পার করছে তারা ।একসময় জেলেপাড়া,কৈবত্য পাড়াসহ রাতাখোর্দ্দ এলাকা ঘিরে ছিল ৪শতাধিক পরিবারের এক পাড়া ।১৯৯১ এর ঘুর্ণিঝড় এর পর থেকে ভাঙ্গন শুরু হলে সে ভাঙ্গনের তোড়ে নি:স্ব হয়ে কয়েকশ, পরিবার গৃহহীন হয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয় ।

স্থানীয় ইন্দ্র সেনের পুত্র সূর্য সেন (৬০)বলেন ভাঙ্গনের তোড়ে নি:স্ব হয়ে ২শতাধিক পরিবার চলে গেছে বাধ্য হয়ে । তাদের মধ্যে অনেকে ভারতে,কাপ্তাই,
চট্রগ্রাম শহরে,বানীগ্রাম,সহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছে ।আমরা যারা অসহায় সম্ভলহীন তারা এখনো মৃত্যুর দুয়ারে বসে আছি ।আমাদের পরিবার এ পর্যন্ত ৫ বার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে গৃহহীন হই ।বর্তমানে কোন রকমে বেচেঁ আছি সাগরকে আকঁড়ে ধরে । কারন আমরা জেলেরা সাগর ছাড়া চলতে পারিনা । সাগরে জাল ফেলে যা পাই তা নিয়ে কোন রকমে সংসার চালাই ।আংগুর বালা দাশ ও কালীকুমার দাশ জানান চোখের সামনে একে একে বিলীন হতে দেখেছি কয়েকশ পরিবার । আমাদের কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই তাই আজো এখানে মাটি আকড়িয়ে পড়ে আছি । আমাদের দেখার জন্য কেউ আসেনা । আমরা প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনের কবলে পড়ে আছি অথচ কেউ আমাদের খোঁজ নেয়না ।শঙ্খের ভাঙ্গন রোধে দুপাশে কাজ চলমান থাকলে অদৃশ্য কারনে জেলে পাড়া ও কৈর্বত্য পাড়া এলাকায় কোন ধরনের কাজ হয়না।ফলে প্রতিদিন ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে এ এলাকার জনগনের বাড়িঘর ।

রায়ছটা গ্রাম এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মোঃ জাহেদুল হক জাহেদ বলেন, চোখের সামনে প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে বাড়ি ঘর । এ ব্যাপারে জরুরী ভিত্তিতে কিছু একটা করা প্রয়োজন না হয় হারিয়ে যাবে এ জেলে ও কৈর্বত্য পাড়াটি।

সাধনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও থানা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা বলেন, এ এলাকার ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের প্রধান প্রকৌশলীকে দরখাস্তের মাধ্যমে জানানো হয়েছে ,আশা রাখি অল্প কিছু দিনের মধ্যে একটা সুরাহা হবে। তবে তিনি এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্থদের পরিষদের মাধ্যমে সহযোগিতার কথা জানান।

পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের উপ-প্রকৌশলী ধীমান চৌধুরী জানান শঙ্খ নদীর ভাঙ্গন রোধে বর্তমান চলমান কাজে জেলে পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের উপ-প্রকৌশলী ধীমান চৌধুরী জানান শঙ্খ নদীর ভাঙ্গন রোধে বর্তমান চলমান কাজে জেলে পাড়া ও কৈর্বত্য পাড়া এলাকায় জন্য কোন বরাদ্দ নেই । তবে আগামীতে যাতে কাজ হয় সে ব্যাপারে বাজেট প্রেরন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান ।

বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া,
খানখানাবাদ ও সাধানপুর ইউনিয়নে
সাঙ্গু নদ সংলগ্ন কয়েক কিলোমিটার এলাকা ভাঙনপ্রবণ। গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে পুকুরিয়া গ্রামের বিপুল পরিমাণ এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী-২ একেএম জুলফিকার তারেক বলেন, পুকুরিয়ায়, খানখানাবাদ ও সাধানপুর এলাকায় আংশিক ভাঙন প্রতিরোধ ও রক্ষা প্রকল্প খুব শীগ্রই গ্রহণ করা হবে।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *