যুবসম্পদের দিকে নজর দিন || তাফহীমুল ইসলাম

একটি দেশকে শাসন করতে হলে শাসককে সর্বপ্রথম সৎ, দক্ষ হতে হবে। সৎ, দক্ষ হওয়ার জন্য তাকে অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। শুধু শিক্ষা নয় গ্রহণ করতে হবে সুশিক্ষা। সেই সুশিক্ষা গ্রহণ করার এখনই সময় তরুণ সমাজের। দার্শনিক বলেছেন-‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত’। এই পাঁচ শব্দের বাক্যটি নিয়ে তরুণদের ভাবা উচিত। চেষ্টা করবো পাঠকের কাছে তুলে ধরতে- আমাদের দেশের তরুণ সমাজের বাস্তব চিত্র।

আগামীতে আমাদেরকে এই বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে হবে তা নিয়ে দেশের তরুণদের কোন চিন্তা নেই বললেই চলে। এই সময়ে একজন তরুণের ভাবা উচিত- কিভাবে আমাদের সময়কালে আমরা দেশের নেতৃত্ব দিবো, কিভাবে দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করবো তা নিয়ে। কিন্তু এমন কয়েকটি জিনিস আবিস্কৃত হয়েছে যে জিনিসগুলো তরুণদের দূরে রেখেছে এমন ভাবনা থেকে। সেই জিনিসগুলোর মধ্যে স্মার্ট ফোনের স্থান শীর্ষে। মোবাইল ফোন এমন একটি জিনিস যেটি সকল সমস্যার মূল। বর্তমানে অধিকাংশ তরুণের অর্ধদিনের বেশি সময় ব্যয় হয় মোবাইলে। শিশু থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম বেশি সবাই মোবাইল আসক্ত। মোবাইল আমাদের জীবনের এমন একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেটা ছাড়া আমাদের জীবন চলা অসম্ভব। আমাদের জীবনে সবচেয়ে কাছের বন্ধু মোবাইল। মোবাইলের উপকারিতা যেমন রয়েছে ঠিক তার বিপরীতে মোবাইলের অপকারিতাও অত্যধিক। বর্তমানে মোবাইল ছাড়া শতকরা দশজন ছাত্র পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। আগেকার দিনে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই অধ্যায়ন শেষে বিভিন্ন গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বই পড়তো আর এখনকার শিক্ষার্থীরা মোবাইল ব্যবহার শেষে সময় পেলে পাঠ্যবই অধ্যায়ন করে। শুধু শিক্ষার্থীরা নয় আজকের শিশুরাও মোবাইলের প্রতি আসক্ত। আমার ভাতিজা ওয়াক্বিফুল ইসলাম। দেড় বছর পূর্ণ হতে বাকী আরো তিনমাস। তাকে খাবার খাওয়ানোর পূর্বে প্রস্তুত করতে হয় মোবাইল। মোবাইলে ভিডিও দেখা ছাড়া কোনদিন তার মুখ দিয়ে খাবার প্রবেশ করেনা। ভিডিও যদি মনের মতো না হয় তাহলে সে তাও বুঝিয়ে দিবে হাতের ইশারায়।

আরেক ভাতিজি হাসনাইন। বয়স মাত্র পাঁচ। রাতে বাবা কর্মস্থল থেকে ফিরলে বাবার মোবাইল নিয়ে চালু করে ফেসবুক। পরিচিতদের ছবিতে লাইকও দেয়। পরেরদিন সকালে বলে চাচ্চু আপনার ছবিতে আমি কাল রাতে লাইক দিয়েছি। শিশুদের এমন মোবাইল আসক্তির পেছনে তার মা-বাবাই দায়ী। ছোটকাল থেকে মা-বাবা তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেয়ার ফলে শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে সর্বত্র।

আজকের তরুণরা মোবাইলের মাধ্যমে নিজেকে জড়াচ্ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। ফেসবুকের মাধ্যমে সূত্রপাত হচ্ছে যৌবন বিধ্বংসীর মতো মারাত্মক অপরাধের। সেবন করছে মাদক, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য। যা সেবনকারীকে মাতাল করে ছাড়ে। এছাড়া দেশের উঠতি বয়সের ছাত্ররা সঙ্গী করে নিয়েছে ধূমপানকে। কলেজ, ভার্সিটির আশেপাশে দেখা যায় ছাত্রদের ধূমপান করতে। কলেজ, ভার্সিটি ছাড়িয়ে এটা স্কুলের ছাত্রদেরও আসক্ত করছে সাম্প্রতিককালে। বিভিন্ন বিনোদন স্পটে দেখা মিলে ছাত্র-ছাত্রীকে আপত্তিকর অবস্থায়। যা ঘটছে পরিবারের দৃষ্টির অগোচরে। যার কারণে পরিবারের সদস্যরা মনে করছে তাদের ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন ভালোভাবে লেখাপড়া করছে। কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্টে প্রমাণিত হয় তাদের ধারণা ভুল। বই কেনা, কোচিং এর নামে পরিবার থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছে বিভিন্ন পার্কে। সেখানে লিপ্ত হচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। এই অপরাধের মাধ্যমে বিভিন্ন মারাত্মক রোগেরও বিস্তার ঘটছে। আজকের দিনের তরুণরা বাড়ি ফিরে রাত বারোটার পরে বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা দিয়ে। বিশেষ করে শহরের ছেলেরা রাতে বাড়ি ফেরে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী। মা-বাবা তাতে আপত্তি করলে তাদের হতে হয় অসম্মানী। সেই ভয়ে মা-বাবাও সহজে ছেলের প্রতি কঠোর হয় না। সেদিন একটি পত্রিকার কলামে পড়লাম- ছেলের বহুগামিতা নিয়ে অসন্তুষ প্রকাশ করায় ছেলে বাবাকে বলেছে, তুমি তো বিয়ের আগে আম্মুর সাথে কতো ডেটিং করেছো! এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতেই সাধারণত অভিভাবকরা ছেলেদের প্রতি সহজে কঠোরতা আরোপ করে না।

ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও পিছিয়ে নেই এসব অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। তারাও ছেলেদের সাথে তাল মিলিয়ে খাচ্ছে সিগারেট, ছেলে বন্ধু নিয়ে ঘুরছে বিভিন্ন পার্কে। বিভিন্ন আকর্ষনীয় বস্তুর প্রলোভন দেখিয়ে ছেলেদের দ্বারা সংঘটিত করছে অপরাধমূলক কর্মকান্ড। মেয়েদের মধ্যে এমন একটি মহল আছে যেটি টাকার বিনিময়ে সব করতে পারে। তাদের কাছে টাকা এলেই সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়। মেয়েদের এই মহলটি শহরে সক্রিয় হলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। তাদের এমন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে যদি কোন দিক থেকে বাঁধা না আসে তাহলে তারা ছড়িয়ে পড়বে চারিদিকে। এই সমস্যা পরিণত হতে পারে মহামারীতে।

একটি দেশের তরুণ সমাজের অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যত নির্ভর করছে কাদের উপর? এমন প্রশ্নের জবাব আসবে নিশ্চয় নেতিবাচক। এই নেতিবাচক দিকটি বাস্তবে লক্ষ্যমান হওয়ার পূর্বে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। তরুণ সমাজের এই সমস্যা এখন ব্যক্তি, সমাজের গন্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কাজেই এই সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি প্রয়োজনীয়। নয়তো তরুণ সমাজের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। গড়ে ওঠবে না দেশের আগামীর সৎ নেতৃত্ব।

লেখক: তরুণ সাংবাদিক

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.