মেয়েরাই এ সমাজে মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু!

মেয়েরাই এ সমাজে মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু!

সালসাবিলা নকি

সন্তানের মা হওয়া যে কোনো নারীর জন্যই সবচেয়ে সুন্দরতম ও মধুরতম অভিজ্ঞতা। কিন্তু কিছু ভুলের কারণে এ সময়টা তিক্তকর সময় হিসেবে স্মৃতির সিন্দুকে জমা হয়ে যায়। আগের দুই পর্বে আমরা মোটামুটি জেনেছি, প্রসব পরবর্তী মায়েদের যে সমস্যাগুলো দেখা দেয় সেগুলো এবং তাদের প্রতি আমাদের আচরণ ও ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত, কেমন হওয়া উচিত নয়।

আজকের কথাগুলো মায়েদের উদ্দ্যেশ্যে। আমি নিজেও একজন মা, কাছ থেকে অনেক মাকে দেখেছি, অনেকের অভিজ্ঞতা শুনেছি। সকলের অভিজ্ঞতাই কমবেশি একই রকম। কারণ, যুগের পর যুগ আমরা একই চক্রে হেঁটে চলেছি। প্রযুক্তিগত উন্নতি হলেও আমাদের মানসিক উন্নতি হয়নি।

সৃষ্টিকর্তা নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে সাজিয়েছেন। মেয়েদের যেমন আবেগ ও কোমলতা ছাড়া মানায় না, তেমনি ছেলেরা হয় বজ্রকঠিন মনোভাবের। ছেলেরা মেয়েদের অনুভূতি মেয়েদের মতো করে বুঝবে না এটাই স্বাভাবিক। তাদেরকে তো কখনও বোঝানোই হয় না। কিন্তু দেখা যায় একবার তারা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে নিলে অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়, ভবিষ্যতের শিক্ষা গ্রহণ করে। খুব খারাপ মানুষ না হলে প্রত্যেকেই কিন্তু স্ত্রীকে ভালোবাসে। তারা নিজ সন্তানের মায়ের সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলোর ক্ষেত্রে যত্নশীল হয়।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, মেয়েরাই মেয়েদের সহমর্মী হয় না। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য হচ্ছে, মেয়েরাই এ সমাজে মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু। কেন সেটা বলছি।

একজন মেয়ে যখন কারও বউ হয়ে বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি উঠে তখন সেখানে শাশুড়ি হয় দজ্জাল, ননদ ভাবীর বিরুদ্ধে কথা লাগায়, জা সাহায্য করার পরিবর্তে শত্রুতা করে। সেই বউ সারাজীবন এই পরিমন্ডলে থেকে নিজে যখন শাশুড়ি হয় তখন তার ভূমিকাও একই হয়। ছেলের বউয়ের সাথে তেমন আচরণ করে যেমনটা তার সাথে তার শাশুড়ি করেছিল। তার নিজের মেয়ে যখন ভাবীর ব্যাপারে কুটনামী করে, তখন মেয়েকে শাসন করার পরিবর্তে প্রশ্রয় দেয়। দুই ছেলের দুই বউয়ের মধ্যে মিল থাকলে তার সহ্য হয় না। যেহেতু তার নিজের অবস্থা এরকম ছিল না।

সোজা কথায় একটা মেয়ে তার একজীবনে যে দুঃখগুলো পায় সেগুলোই সে খুব যত্ন করে সাজিয়ে গুজিয়ে আরেকটা মেয়ের পাতে তুলে দেয়। কখনও ইচ্ছাকৃত, কখনও অনিচ্ছাকৃত, কখনও অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়।

Related Post

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও জরুরী। কারণ, আপনি যখন একজন নতুন মা, তখন আপনার কাছের মহিলারাই সবার আগে কখনও জেনে, কখনও না জেনে কথাবার্তায়, আচরণে আপনাকে কষ্ট দেবে। বেশিরভাগ মহিলাদের একটা কমন ডায়লগ, ‘আমরাও তো বাচ্চার মা হইছি বা আমরাও একসময় বাচ্চার মা ছিলাম’।

যদিও এই কথাগুলো বিছানায় শুয়ে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে শুনবেন, অথবা কয়েকরাত না ঘুমানোর ফলে মাথা-ব্যথায়, দুর্বলতায়, বিষণ্ণতায় ভুগবেন, সেসময়ই শুনবেন, তারপরও চেষ্টা করবেন কানে না ঢুকাতে। আমি বলব, কোনো কথা আপনার মন মতো হয়নি, ‘জাস্ট ইগনর ইট।’ ‘তুমি বাচ্চা পালতে জানো না, আমাদের সময় এতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না, এটা এভাবে করলে কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি… কথাগুলো যখন শুনবেন, নিজেকে বলবেন, ‘লেট ইট গো’ দরকার নেই এসবে কষ্ট পাওয়ার।

আপনার মন মতো না হোক, ভুল হোক, অযৌক্তিক হোক, পরিবারের বড়রা কিন্তু আপনাদের খারাপ চায় না। যেসব পরামর্শ দেয় ভালোর জন্যই দেয়। এসব ভেবে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। আমাদের মা-দাদীদের সময় ইন্টারনেট ছিল না। এখন আমরা যখন তখন গুগল ক্লিক করে যে কোনো কিছু জানতে পারি। তাই তারা পরামর্শ দিলে সেটা মানতেই হবে এমন নয়। হাসিমুখে তাদের কথা শুনুন। পারলে সায় দিন। তারপর সুযোগ মতো সেই বিষয়ে ইন্টারনেটে সার্চ দিন। যাদের হাতের কাছে ইন্টারনেট নেই তারা বই কিনতে পারেন। আজকাল নবজাতক বাচ্চার যত্ন নিয়ে অনেক ভালো ভালো বই পাওয়া যায়।

নিজেকে ভালো রাখার জন্য অন্যের ওপর নির্ভর্রশীল হয়ে আসলে লাভ নেই। আপনার নিজের ভালো নিজেকেই বুঝতে হবে। লাউ, কালোজিরা খেতে খেতে আর ভালো লাগছে না, আপনার স্বামীকে বলুন। দেখবেন সে আসার পথে চিকেন বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে আসছে। অথবা মজার কোন কুকিজ, চকলেট যেটা খেতে ইচ্ছে করে বলে ফেলুন। আপনি তার সন্তানের মা। সে খুশি মনেই আপনার কথা শুনবে।

পুরুষদের সাথে অভিমান করে আসলে লাভ নেই। আপনি আশা করে বসে আছেন, অফিস থেকে আসার পথে আপনার জন্য সে ফুল বা গিফট নিয়ে আসবে। কিন্তু কিছুই আনল না দেখে গাল ফুলিয়ে বসে থাকলেন, তাহলে আপনার ও তার বাকি সময়টাই খারাপ যাবে। সারাদিন বাইরে তার কী কী ঝামেলা গেছে সেসব তো আর আপনি জানেন না। হাসিমুখে তাকে ঘরে স্বাগত জানান। শরীর খারাপ বা কোনো বিষয়ে মন খারাপ থাকলে সেটাও অকপটে বলে দিন। শান্তিতে থাকতে হলে কথা বলার বিকল্প নেই। রাগ করে চুপ করে থাকলে কোনো কিছুই হাসিল হয় না।

বাচ্চা হওয়ার পরই বেশিরভাগ মা নিজেকে ভুলে যান। যখনই সুযোগ পাবেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখুন। ‘মোটা হয়ে গেছি, কুৎসিত হয়ে গেছি’ এসব ভেবে হতাশ হওয়ার জন্য না। বাচ্চা হওয়ার পর পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। এটাকে মেনে নিয়েই খুঁজে দেখুন এখন আপনার কী করার আছে। সুযোগ পেলেই চুল আঁচড়ান। চুল আঁচড়ালে স্কাল্পে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। এটা চুলের জন্য তো উপকারীই, আবার চুল আঁচড়ালে মনও ভালো থাকে। সপ্তাহে একদিন প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি ফেস মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। না করলেও সমস্যা নেই। নিজেকে ভালো রাখার জন্য যেটা করতে ইচ্ছে করে সেটাই করুন।

যখনই সময় পাবেন ঘুমিয়ে নিন। নিদ্রাহীনতা মানসিক অবসাদ বাড়ায়। রাতে বাচ্চা না ঘুমালে আপনাকেও জেগে থাকতে হয়। তখন এমন কিছু করুন যাতে আপনার সময়টা ভালো কাটে। বই পড়তে পারেন। বাচ্চার ছবি তুলতে পারেন। ইন্টারনেটে বাচ্চার যত্ন নিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন। আর কিছু না পারলে, বাচ্চাকে নিয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাগুলো এখনই করে ফেলতে পারেন।

মোটকথা, এ সময়টা উপভোগ করুন। বাচ্চা দিন দিন বড় হয়। চাইলেই এই দিনগুলো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই কে কী বলল সেটা নিয়ে পরে থেকে নিজের ও বাচ্চার ক্ষতি করার কোন মানেই হয় না। এমন একজনকে মনের কথা সব মন খুলে বলে ফেলুন যে আপনাকে বোঝে। সেটা হতে পারে আপনার বোন বা বান্ধবী। সর্বোপরি ভালো থাকুন। কারণ, আপনি ভালো থাকলেই, ভালো থাকবে সন্তান আর সংসার।

Recent Posts

  • সারা বাঁশখালী
  • দুর্ঘটনা
  • শীর্ষসংবাদ

ভাইকে এয়ারপোর্টে দিয়ে বাঁশখালী ফেরার পথে সড়কেই প্রাণ গেলো মহিউদ্দীনের

আবু ওবাইদা আরাফাত || বাঁশখালী টাইমস: গত পরশু চাচাতো ভাইকে দুবাই ও গতকাল আপন ভাই…

5 hours ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

লকডাউনে বাঁশখালী সরকারী হাসপাতালের এম্বুলেন্সে যাত্রী পরিবহন!

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী টাইমস: সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য…

6 hours ago
  • সংগঠন সংবাদ
  • শীর্ষসংবাদ

সাধনপুর ইসলামী পাঠাগারের ইফতার বিতরণ

করোনা মহামারীর এই কঠিন সময়েও প্রতিবছরের মতো এইবারো পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে পশ্চিম সাধনপুরে শতাধিক…

7 hours ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

কয়লা বিদ্যুৎ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ আরও ২ শ্রমিকের মৃত্যু

বাঁশখালী টাইমস: বাঁশখালীর গন্ডমারায় নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুলিশ- শ্রমিক সংঘর্ষের ঘটনায় আরও ২ গুলিবিদ্ধ…

14 hours ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • জনদুর্ভোগ
  • সারা বাঁশখালী

বাঁশখালীতে রমজানেও থামছে না পল্লী বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং

জসীম উদ্দীন: বাঁশখালীতে রমজান মাসেও থেমে নেই পল্লী বিদ্যুতের হয়রানি। গ্রীষ্ম কাল শুরু হতে না…

2 days ago
  • প্রেস বিজ্ঞপ্তি
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

বাঁশখালীতে কোরআনের তাফসীর বিতরণ ও ফ্রি কোরআন শিক্ষা কোর্স চালু

বাঁশখালী স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাঁশখালীর শীলকূপ ইউনিয়নে পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে এক মাস ব্যাপী…

2 days ago