বিশ্ব শিক্ষকদিবস এবং বেসরকারি অনার্স শিক্ষক

আজ ৫ অক্টোবর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের
মতো বাংলাদেশেও পালন করা হবে বিশ্ব
শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সালে দিবসটি পালন
করা শুরু হলেও বেশ জোরেশোরে পালন
হয়ে আসছে ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর
থেকে। শিক্ষকদের সম্মান ও স্বীকৃতি
জানানোর জন্য বিশ্বব্যাপী দিবসটি
পালন করা হয়ে থাকে।গত বছরে র
প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো – ” শিক্ষকদের
মূল্যায়ন করা ও তাদের অবস্থার উন্নয়ন
ঘটানো”। প্রতিবছর দিবসটি আসে এবং
যায় কিন্তু শিক্ষকদের জীবনমানের
উন্নয়ন হয় কতটুকু? ধরুন- জাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত বেসরকারি
অনার্স – মাস্টার্স পর্যায়ে নিয়োগ
প্রাপ্ত শিক্ষকরা ২৩ বছর দিবসটি অতি
আগ্রহে পালন করেও বিনা বেতনে বা
নামমাত্র বেতনে মানবেতর জীবন যাপন
করছেন। সরকারি ও জাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক
নিয়োগ পেয়ে জাতিকে উচ্চ শিক্ষায়
সুশিক্ষিত করেও প্রায় ৫০০০ শিক্ষক
বেতনহীন অবস্থায় অনাহারে- অর্ধাহারে
জীবনাতিপাত করছেন। এই দায় রাষ্ট্র
কোন ভাবেই এড়াতে পারবেনা। উন্নত
জাতি গঠনে শিক্ষকরাই সমাজের
অভিভাবক।অবহেলিত শিক্ষক সমাজ যদি
রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন
প্রাপ্তির নিশ্চয়তা না পায়, তবে
কিভাবে মানসম্মত উচ্চ শিক্ষার দ্বার
উন্মোচন হবে?
ইউনেস্কোর মতে, বিশ্ব শিক্ষক দিবস
শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের
অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ পালন
করার কথা।কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত
বেসরকারি কলেজগুলোতে ভিন্ন চিত্র
লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনার্স ও মাস্টার্স
কোর্সের বৈধভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত
শিক্ষকদের যুগ যুগ বেতনহীন অবস্থায়
রেখে শ্রমদাস বানিয়ে রাখা হয়েছে।এসব
শিক্ষকদের এমপিওভূক্ত না করে খাটানো
সংবিধানের পরিপন্থী কিনা তা ভেবে
দেখার জন্য সুশিল সমাজের প্রতি বিনীত
অনুরোধ রাখা আমার কর্তব্য বলে মনে
করছি।এ বছর যখন দিবসটি পালিত
হচ্ছে,তখন বহুল আলোচিত বিষয়গুলো :
শিক্ষকদের অবদান ও ত্যাগ
স্বীকার,কর্মক্ষেত্রে তাদের নানামুখী
সমস্যা, জনবল সংকট,শিক্ষা ব্যবস্থাপনা,
সরকারি বেসরকারি বৈষম্য,দীর্ঘ সময়
বেতনহীন থাকা,শিক্ষা বানিজ্য ও
ক্রমহ্রাসমান বরাদ্দের মতো দিকগুলো
ভেবে দেখা দরকার।উপরোক্ত বিষয়গুলোর
সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া মেধাবীদের
শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করা এবং ধরে
রাখা সম্ভব নয়।এর ব্যতিক্রম হলে হয়তো
শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার হার হার
কমলেও,বাড়বে মেধাবী শিক্ষক ঝড়ে
পড়ার হার। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে,
বস্তুগত ও সামাজিক মর্যাদায় বেতন
একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক। বিভিন্ন
জরিপে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে,বেসরকারি
কলেজের নিয়োগ প্রাপ্ত অনার্স
শিক্ষকদের উল্লেখযোগ্য অংশ
এমপিওভুক্ত হতে না পেরে শিক্ষকতার
মতো একটি মহান পেশা ছেড়ে রুটিরুজির
টানে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ফলে
শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না পর্যাপ্ত ক্লাস
করার সুবিধা।এভাবে চলতে থাকলে
বেসরকারি কলেজ পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষায়
ধ্বস নামতে বাধ্য।
বিশিষ্টজনের পর্যবেক্ষণে শিক্ষকতা
পেশার বর্তমান হাল হাকিকত সম্বন্ধে
সরকারের নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা
প্রশাসনের যথেষ্ট বিমাতা সুলভ আচরণ
লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ
বেসরকারি কলেজ অনার্স – মাস্টার্স
শিক্ষক পরিষদ ২০০৮ সাল হতে শিক্ষা
মন্ত্রনালয়,অধিদপ্তর,জাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয়, ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
বরাবর আবেদন নিবেদন করে আসছে।
তাছাড়াও মাঠ পর্যায়ে পেশাজীবী
সংগঠনের বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে
অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন – সংগ্রাম
চালিয়ে যাচ্ছে।এমপিওভূক্তির অসহনীয়
জ্যামে পড়ে দীর্ঘ ২৫ বছর কেটে গেলেও
এই শিক্ষকদের বিষয়ে কেউ কোন কর্ণপাত
করার প্রয়োজন মনে করছেনা। অথচ
ইদানিংকালে বেসরকারি কলেজের উচ্চ
শিক্ষার মান নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ
লক্ষ্য করা গেলেও প্রকৃত কারন উদঘাটন
করতে সরকারের শিক্ষা প্রশাসকগন সক্ষম
হয়েছেন কিনা- তা জানা নেই।মানসম্মত
উচ্চ শিক্ষার পেছনে হাজার হাজার
অনার্স -মাস্টার্স শিক্ষকের আর্থিক
বিষয়টি ( এমপিও) নিশ্চিত করতে হবে, তা
কি নীতিনির্ধারকরা ভেবেছেন?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কী এক অদ্ভুত
কারনে বেতনের নিশ্চয়তার কথা না
ভেবে এখনো ব্যাঙের ছাতার মতো
যত্রতত্র বেসরকারি কলেজে অনার্স
কোর্স চালু করছে তা বোধগম্য নয়।জাবি
কর্তৃপক্ষ অনার্স শিক্ষকদের দুর্দশার কথা
জেনেও পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্তদের বিহিত
না করে বরং বেতনের দায়ভার কলেজ
কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে লাগামহীন
বা অনেকটা বেপরোয়াভাবে শিক্ষক
নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে।এমতাবস্থায়
অনতিবিলম্বে অনার্স – মাস্টার্স
শিক্ষকদের জনবল কাঠামোতে অন্তর্ভূক্ত
করে এমপিওভূক্ত করলেই কেবল আজকের
দিবসটি পালন করা স্বার্থক হবে,অন্যথায়
এসব দিবস পালন নিরর্থক।
লেখক:হারুন অর রশিদ
প্রভাষক ও সাধারন সম্পাদক
বেসরকারি কলেজ অনার্স – মাস্টার্স
শিক্ষক পরিষদ,কুড়িগ্রাম জেলা শাখা।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top