বিজয় দিবস ও তারুণ্যের অনুভূতি

মহান বিজয় দিবস

মুক্তিযোদ্ধাদের অনুভূতি ও তারুণ্যের ভাবনা

…….শামসীর হারুনুর রশীদ

 

1971 সালের  ডিসেম্বর হতে 2016 ডিসেম্বর পর্যন্ত 44টি বছর শেষ হতে যাচ্ছে। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বরের আগে-পরে, বিজয় দিবস প্রসঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়, এককভাবে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাগণের জন্য বা মুক্তিযোদ্ধাগণ দ্বারা কোনো না কোনো প্রকারের অনুষ্ঠান হয়, সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধে সম্মান জানানো হয়, রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছাভেদে জাঁকজমকপূর্ণ কুচকাওয়াজ ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মকাণ্ডগুলোর উদ্দেশ্য কিছুটা স্মৃতিচারণমূলক, কিছুটা আবেগ জাগানিয়া, কিছুটা দেশপ্রেম জাগানিয়া, কিছুটা আত্মসমালোচনা সৃষ্টিকারী এবং কিছুটা আনন্দ প্রদানকারী। অতীতের বছরগুলোর তুলনায়, এবারের ১৬ ডিসেম্বর একটু ভিন্ন বা ব্যতিক্রমী পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে উপস্থিত হতে যাচ্ছে। এ খেয়াল রেখেই টুকরো কিছু কথা বলতে মন চাচ্ছে। অর্থাৎ অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বছর বাংলাদেশে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রোপট (Socio-Economic and Political background)  তথা সাম্প্রতিককালের ঘটনাবলী, এবারের বিজয় দিবসটিকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করবে বলে মনে হচ্ছে। চলমান নিবন্ধটি নানা জনের নানা কথার ফুলজুরিতে সাজানো।

(এ লেখাটি “বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও বর্তমান প্রেক্ষাপট” শীর্ষক সেমিনার 2013 থেকে ফিরে নোট করেছিলাম, অনেকদিন পর হারানো ডাইরিটি পেয়ে এই পুষ্ট )

বিজয় দিবসের তাৎপর্য :

দিবসের তাৎপর্য বিভিন্ন বয়সী ও বিভিন্ন পেশাজীবীর নিকট কম-বেশি ভিন্নভাবে প্রতিফলিত বা উদ্ভাসিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা তথা মুক্তিযুদ্ধ ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর স্বাক্ষী। বয়সের ভারে এবং অন্যান্য সাংসারিক চাপে তারা অনেকেই কান্ত। তাদের নিকট বিজয় দিবসের তাৎপর্য এবং ৭১ পরবর্তী প্রজন্মের নিকট ঐ দিবসটির তাৎপর্য কম-বেশি ভিন্ন হওয়ায় স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল অব. মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ ইব্রাহিম বলেন-

‘প্রতি বছর যখন ১৬ ডিসেম্বর আসে তখন আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যুদ্ধ করেছিলাম এবং যুদ্ধের মাধ্যমে একটি আক্রমণকারী বা হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। আমরা কিছু অনুভূতি ও চেতনাকে অন্য কিছু অনুভূতি ও চেতনার উপর অধিকতর মূল্য দিয়ে স্থাপন করেছিলাম। বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা শুরু করেছিলাম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন্ধ্যা থেকে। মরুভূমিতে রাত্রে পথ চলার সময় পথিক যেমন বারবার আকাশের উত্তরাংশে উজ্জ্বলভাবে স্থিত ধ্রবতারার দিকে তাকায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে তার গন্তব্যের দিক ঠিক আছে কিনা, অথবা আধুনিক যুগে সৈনিক বা নাবিক কম্পাস এর কাঁটা মিলিয়ে দেখে গন্তব্যের দিক ঠিক আছে কিনা, তেমনই রাজনৈতিকভাবে আমরা প্রতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর আসলে অন্তত একবার হিসাব মিলানোর সুযোগ পাই। কিসের উপর বিজয় অর্জন করেছিলাম, অর্জনটুকু ঠিক আছে না য়ে গিয়েছে এবং পথভ্রষ্ট বা ল্যক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে থাকলে কী করা যেতে পারে? বিজয় দিবসের স্বাভাবিক তাৎপর্য হচ্ছে গৌরবের, দৃপ্ততার, দেশপ্রেম উজ্জীবনের এবং শপথ পুনরুচ্চারণের’।

১৯৭১ সালে কার উপর কিসের বিজয় ছিল?

তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে: (এক) পাকিস্তানী সামরিক শাসন তথা স্বৈরশাসনের উপর বিজয় অর্জন করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের শক্তি ও ইচ্ছা। (দুই) পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কর্তৃপ বাধ্য করছিল বাঙালিদেরকে পাকিস্তানে থাকতে। ঐ প্রক্রিয়াকে অস্বীকার ((Deny) করত: স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়ার অধিকার আদায় হয়েছিল। (তিন) পাকিস্তানী অগণতান্ত্রিক অভ্যাস ও রেওয়াজের বিপরীতে বিজয় অর্জন করেছিল গণতান্ত্রিক অভ্যাস, ও চিন্তা-চেতনা। (চার) পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব  পাকিস্তানী বাঙালি জনগোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিবাদের বিজয় হয়। (পাঁচ) পাকিস্তানী সরকার ও শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক, শান্তি ও সাম্যের মহান ধর্ম ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনগণের উপর বর্বরতা বাস্তবায়ন ও অসাম্যের ধারা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জয় হয় তথা মানবিকতা বা মানবতাবাদেরর জয় হয়।

আজকের আলোচনার ফোকাস দীর্ঘ প্রায় ২২-২৩ বছরের বিভিন্ন মাত্রার ও আঙ্গিকের সংগ্রামের সর্বশেষ ধাপ হল ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ। সূক্ষ্ম হিসেবে ২৬৬ দিন। যাহোক আমরা ১৯৭১ এর আলোচনায় আসি। ২৫ মার্চ ১৯৭১ দিবাগত রাত্রে ১২টা বা ১২টার পর তথা ২৬ মার্চ প্রত্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে ভারতের সাহায্য সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। অক্টোবর মাসে প্রবাসী মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশী সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটা গোপন চুক্তি হয়। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পরোক্ষ সহযোগিতার মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান প্রত্যক্ষ্যভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ন ৪টা পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাগণ যথা ‘জেড’ ফোর্স, ‘এস’ ফোর্স, ‘কে’ ফোর্স এবং বিভিন্ন সেক্টর এর সেক্টর ট্রুপসগণ, এতদিন যেমন যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন তেমনই চালাতে থাকলেন তবে ৩ ডিসেম্বর থেকে সেটা চালানো হল—ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোর (ইংরেজিতে সামরিক পরিভাষায় : অর্ডার অব ব্যাটল or ORBAT) সঙ্গে তাল মিলিয়ে, যৌথ কমান্ডের অধীনে, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তি বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধাগণ যারা সারা বাংলাদেশে গ্রামে গঞ্জে শহরে নগরে ছড়িয়ে থেকে যুদ্ধরত ছিলেন তারা, বিগত মাসগুলোর মতো প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক গেরিলা তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। সার্বিকভাবে ভারতীয় ও মুক্তি বাহিনীর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে, ১৬ ডিসেম্বর তারিখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়।

আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের রেকর্ড এবং ছবি অনুযায়ী, পাকিস্তানীদের পক্ষে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড এর কমান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজী এবং আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন ভারতীয় সেনা বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড এর কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি তৎকালীন কর্নেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না (বা তাঁকে উপস্থিত রাখা হয়নি!!)। প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর কোনো প্রতিনিধিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধকালীন উপ-প্রধান সেনাপতি গ্রুপ কেপ্টেইন এ কে খন্দকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ছবিতে, দন্ডায়মান দ্বিতীয় সারিতে তাঁর চেহারা দেখা যায় ভিরের মধ্যে। অর্থাৎ জিনিসটা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, ১৩ দিনের দীর্ঘ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে এবং ঐ যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানীগণ ঐ যুদ্ধের বিজয়ী ভারতীয়দের নিকট আত্মসমর্পন করছে। ইংরেজিতে দুইটি শব্দ আছে যথা মার্জিন বা মার্জিনালাইজড (Margin, Marginalized)। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে অপরাহ্নে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সফলভাবেই মুক্তিবাহিনীর অবদান ও সাফল্যকে মার্জিনালাইজড করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ও বিজয়ের আনন্দ ঐ বিকালবেলায় ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। দুই বছর পর সিমলায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর যেই চুক্তি স্বারিত হয়েছিল, সেই চুক্তির ফলেও বাংলাদেশের মানুষের এবং মুক্তিযোদ্ধাগণের অবদানকে মার্জিনালাইজড করে ফেলা হয়। এতদসত্ত্বেও, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং মুক্তিযোদ্ধাগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সচেতন জনগণ নিজেদের প্রেরণায়, নিজেদের আত্মসম্মানের তাগাদায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসকে একান্তই নিজেদের বিজয় হিসেবে সমুন্নত রেখেছে সফলভাবে। ঐ বিজয়টি বাস্তবে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এবং ঐ আমলের বাংলাদেশের জনগণের। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ১৯৭১ এর বিজয়টি প্রেরণার একটি অম্লান চিরন্তন উৎস। এই উৎসকে অক্ষত রাখা অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিগত 44 বছর যাবত ক্রমান্বয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্রমবিকাশ এবং 2016 সালের ডিসেম্বরে এসে কোথায় স্থিত।

১৯৭১ এর রণাঙ্গণে রক্ত বিনিময়ের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশ নামক দুইটি রাষ্ট্রের মধ্যে এবং দুইটি রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে যেই সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল সেই সম্পর্কটির উষ্ণতা বিগত 44 বছর সময়কালে একইরকম থাকেনি। বিগত 44 বছরে উভয় দেশের মধ্যে তিক্ততা যেমন ছিল তেমনই মধুর সম্পর্কের সময়ও ছিল। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং ভারতীয় স্বার্থের মূল্যায়নে সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় ছিল ২০০৯ থেকে নিয়ে আজ অবধি। ১৯৭১ সালের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে, প্রকাশ করতে হবে এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ উপকার প্রদান করতে হবে; এটাই বাস্তব। কিন্তু কৃতজ্ঞতার সীমারেখা কতটুকু, অর্থাৎ কতটুকু পরিমাণ ভাষা প্রয়োগ, কতটুকু পরিমাণ উপকার প্রদান, কতটুকু পরিমাণ স্বার্থ-ত্যাগ করলে বলা হবে যে, বাংলাদেশ যথেষ্ঠ কৃতজ্ঞ; এই সীমারেখা কোনোদিনই চিহ্নিত হয়নি। এই প্রসঙ্গটি আলোচনা করতে গেলেই, আলোচনাকারীকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করে ফেলা হয়। বাংলাদেশ ভারতকে অনেক কিছুই দিল। আরও অনেক কিছু দেয়ার জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকার মনে হয় প্রস্তুত এবং আগ্রহী। কিন্তু সময়ের অভাবে পেরে উঠেনি। তাই আরও সময় চায়। মনে হচ্ছে যেন, বাংলাদেশ দিতেই থাকবে এবং ভারত নিতেই থাকবে, এরকম একটি পরিস্থিতি।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং  ইলাস্টিসিটি অফ গ্রাটিচিউড তথা কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে যথেষ্ঠ বলা হবে? ইলাস্টিক বস্তুকে যেমন বেশি টানলে ছিঁড়ে যায়, তেমনই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রক্রিয়াকে যদি টানতেই থাকে কেউ তাহলে সেটা ছিঁড়ে যেতে বাধ্য। আমার প্রশ্ন, আমরা কতটুকু টেনেছি? আমাদের নিকট থেকে কৃতজ্ঞতা আদায়ের নিমিত্তে বা কৃতজ্ঞতার উসিলায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র কী চায়? ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর সাম্প্রতিক সফরের মাধমে ভারতের মনের কথা বা ই্চ্ছা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। আমার অনুভূতি হচ্ছে বাংলাদেশে চলমান সংকট এবং সংকটের বাই প্রোডাক্ট বা ফলশ্রুতিতে যে সহিংসতা চলছে, এবং সরকার কর্তৃক পরিচালিত অমানবিক দমন-পীড়ন সম্ভব হতো না, যদি সরকারের পাশে শক্তিশালী কেউ না থাকতো। গত ৮ ডিসেম্বর ২০১৩, প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদের এক সাক্ষাৎকারে কথাগুলো স্পষ্টভাবে এসেছে।

দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়-অমোচনীয় বিভাজন। এবিষয়ে ক’জন রাজনীতিবিদ 2013 সালে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বলেন-

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি জাতি তথা বাংলাদেশের জনগণ যেই একতাবদ্ধ রূপ পৃথিবীকে দেখিয়েছিল, সেটি আজ নেই। দেশ আজ দুইভাগে বিভক্ত। এই কথাটি হাজারও লোকে বলছেন। অনেক বছর আগে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব সাইফুর রহমান তিনিও বলতেন: ওয়ান কান্ট্রি, টু নেশন। দেশ যে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেল এটি কি পরিকল্পিত নাকি অপরিকল্পিত? আমার মতে এটা কিছুটা পরিকল্পিত কিছুটা অপরিকল্পিত। এইরূপ বিভাজিত জাতির জন্য স্থিতিশীল ধারাবাহিক অগ্রগতি, অথবা অপর ভাষায়, অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় স্থিতিশীলতা আনয়ন কঠিন কাজ। বিভাজিত জাতির দুইটি ভাগের বৈশিষ্ট্যগুলো বিপরীতমুখী। একভাগ ভারত পছন্দের আরেক ভাগ ভারত অপছন্দের। যারা ভারত পছন্দের তারা, অপরভাগকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে। আজকের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ষোলো কোটি। অথচ ১৯৭১ সালে জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। যেই সকল লোক ১৯৭১ সালে বয়স ও লেখাপড়ার কারণে পরিপক্ক জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন এবং নিজের স্বাধীন মত গঠন করে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন এবং এখনও বেঁচে আছেন, ঐরূপ লোকের সংখ্যা আজকের তারিখে কত হতে পারে? এর উত্তর উপস্থিত সুধীমণ্ডলী প্রত্যেকের নিজ নিজ বিবেচনায় অংক করে নিতে পারেন, কারণ আমি নিখুঁত তথ্য দিতে পারবো না। নিখুঁত তথ্য (স্টাটিস্টিকস) না থাকলেও, তাদের সংখ্যা আজকে যে পঞ্চাশ হাজার বা এক লক্ষের বেশি নয় এটা বলা যায়। শুধুমাত্র এই পঞ্চাশ হাজার বা এক লাখের কারণে সমগ্র জাতিকে দুইভাবে ভাগ করা কি প্রয়োজন নাকি অন্য কোনো অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে জাতিকে ভাগ করা হয়েছে, এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। জাতিকে বিভাজন করার যে প্রচেষ্টা অতীতে চালু হয়েছিল সেটি আজ পরিপক্কতা পেয়েছে। জাতিকে বিভাজন না করেও ১৯৭১ সালের বিজয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখা যায় কিনা, সেই চেষ্টা গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়নি বলে আমার মনে হয়। আমাদের জাতির মধ্যে ইতোমধ্যেই কঠোরভাবে উদ্ভাসিত বিভাজন, আদৌ দূর করা যাবে কিনা সেটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন।

মূল প্রবন্ধে সৈয়দ ইব্রাহিম আইন-শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে বলেন-

বিরাজমান আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি এবং কারণের শিকড়(Root-cause)।

২০১১ সালের জুন মাসে পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ করা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, বাংলাদেশের জন্য একটি অশনি সংকেত বয়ে আনে। স্থানাভাবে এখানে বিস্তারিত বিবরণে যাচ্ছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে ভুল-ভ্রান্তি বা সীমাবদ্ধতা ছিল এটা সকলেই স্বীকার করেন এবং সাধারণভাবে সকলের মত ছিল যে, ঐ ভুলভ্রান্তি বা সীমাবদ্ধতাগুলো সংশোধন করে পরবর্তী নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু ঐ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে দেয়া হয়। বাতিল করা হয়। সেখান থেকেই সংকটের শুরু। আজকে সংকটটিকে অনেক মানুষই দুটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থের সংঘাত বলছে। আমি এই ধরনের অভিমতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। রাজনৈতিক দল চেষ্টা করবে মতায় যেতে, অথবা পুনরায় নির্বাচিত হয়ে মতায় থেকে    যেতে—এটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি যদি ম্যানিপুলেইট (manipulate) করা হয়, তাহলে সেটাকে স্বাভাবিক বলতে আমি সম্মত নই। এই মুহূর্তে সংকটটি এই ম্যানিপুলেশন নিয়ে। অর্থাৎ (আমার মতে) ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আড়াই বছর আগে পঞ্চদশ সংশোধনী বাস্তবায়ন করেছেন যেন নিজেদের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায় এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে যেন তারা দ্বিতীয়বার মতায় আসতে পারে, এই উদ্দেশ্যে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অনেক সময় দুর্বলভাবে বলতে চেষ্টা করে যে, তারা সুপ্রীম কোর্টের একটি  রায়ের পরিপ্রেেিত এই সংশোধনী এনেছেন। কথাটি অসত্য। এখন থেকে ছয় সপ্তাহ আগে, বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা দি ডেইলী স্টার এর সম্পাদক জনাব মাহফুজ আনাম জিটিভি নামক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রদত্ত নাতিদীর্ঘ সাাৎকারে সুপ্রীম কোর্টের ঐ রায়টিকে, রায় প্রদানকারী প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক কর্তৃক দেওয়া রায়টিকে “পলিটিক্যালী ইরেসপনসিবল জাজমেন্ট” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আমারও ব্যক্তিগত মূল্যায়নে ঐ রায় এবং জাতীয় সংসদ কর্তৃক আনীত সংশোধনী নেতিবাচকভাবে পারিস্পরিকভাবে সম্পৃক্ত। ফলাফল হচ্ছে আজকের বাংলাদেশের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। আড়াই বছর আগে বা দুই বছর আগে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সম্ভবত অনুমান করেনি বা মূল্যায়ন করতে পারেনি যে, ২০১৩ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এই সংশোধনবিরোধী আন্দোলন কতটুকু গভীর এবং ব্যাপক হতে পারে। এখন থেকে তিন মাস আগে বা ছয় মাস আগে এইরূপ সহিংস পরিবেশ ছিল না। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন পরিচালনার চেষ্টা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু সেটাকে ক্ষমতাসীন সরকারি দল মূল্যায়ন করেনি। যাহোক এবং যে যাই বলুক না কেন, আমরা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করতে পারছি যে, আজকে বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি কোনো অবস্থাতেই স্বাভাবিক নয় বরং প্রতিনিয়তই অবনতিশীল। জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধিও তাঁর প থেকে অবদান রাখতে চেষ্টা করেছেন, ফলাফল আপনাদের জানা। এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হচ্ছে এইরূপ পরিস্থিতিতে বা পরিবেশে আমাদের কী করণীয়?

আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। এই দেশ এবং রাষ্ট্র আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। এই দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি আমাদের কী দায়িত্ব আছে? ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আমরা চিন্তা করতে চাই আসলে আমাদের বিজয় সুসংহত হয়েছে কিনা। যদি না হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কী করতে পারি?

21/ 11/ 16

শামসির হারুনুুর রশীদ

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *