বাঁশখালীর ( Banshkhali ) কৃতিসন্তান বিশ্বখ্যাত ব্যাংকার আবরার আনোয়ারের গল্প

হতে চেয়েছিলেন বিমানের পাইলট, আর সেভাবেই পড়া-শোনাটা চালিয়ে আসছিলেন তিনি। চট্টগ্রামের সেইন্ট প্লাসিড হাই স্কুল থেকে সায়েন্স গ্রুফ থেকে এসএসসি, তারপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর হঠাৎ কী মনে করে পড়াশোনার ট্র্যাক চেইঞ্জ করে ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঢাকার আইবিএ থেকে করলেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন।আইবিএ থেকে বের হয়েই হাই স্যালারি নিয়ে যোগ দিলেন বিদেশের একটা কম্পানিতে। কিন্তু তিনি আবারো ট্র্যাক চেইঞ্জ করলেন।হাই স্যালারিড জব ছেড়ে Management Trainee হিসেবে যোগ দিলেন ANZ Grindlays Bank এ। এভাবেই বিমানের পাইলট না হয়ে পরবর্তিতে তিনি হয়ে ওঠলেন একটি বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকের ‘পাইলট’। যাঁর কথা বলছিলাম তিনি বাঁশখালী ( Banshkhali ) পুকুরিয়ার কৃতি সন্তান জনাব আবরার আলম আনোয়ার। জনাব আবরার আলম আনোয়ার-ই প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী যিনি বিদেশী ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-বাংলা

দেশের ম্যানেইজিং ডিরেক্টর এবং সিইও হিসেবে নিয়োগ-প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ব্যাংকার হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্পোরেইট এবং ইনভেস্টমেন্ট সেক্টরে তাঁর রয়েছে দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিজ্ঞতা। তাঁর হাত ধরেই দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে প্রথম সিন্ডিকেইট ফাইন্যান্সিং এর যাত্রা শুরু হয়। জ্বালানী-শক্তি, রপ্তানী-বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং টেলিকম-বেইজড শিল্পকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য সাফল্যের দাবিদার।

বাংলাদেশে সফলভাবে সিইওর দায়িত্বপালনের পর সম্প্রতি তিনি তাঁর সাফল্যের পুরস্কারস্বরূপ স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক মালেশিয়ার MD & CEO হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। এই সফল ব্যাংকার ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের ‘Celebrating Life’- দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে তাঁর জীবনের সফলতা ও বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলেছেন, তরুন ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা কীভাবে সফল হতে পারে সে বিষয়ে দিয়েছেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও।

মূল সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন ডেইলি স্টারের রাফি হোসাইন।
( পরিমার্জিত ভাষান্তর: জসীম উদ্দীন)

■ডেইলি স্টারঃ বাংলাদেশে কোন বিদেশী ব্যাংকের সিইও হিসেবে আপনার নিয়োগপ্রাপ্তিটা একটা নজিরবিহীন কৃতিত্ব। আপনি কীভাবে এই সফলতা অর্জন করেছেন?

আবরার এ. আনোয়ারঃ আমি মনে করি একাকী কেউ কোন কিছুই অর্জন করতে পারে না।
কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গ্রাহকদের সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই আমার আজকের এই সফলতা এসেছে।আমি কেবল আমার টিমকে সাপোর্ট দিয়েছি এবং দিক-নির্দেশনা দিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছি।তাই আমার আজকের এই সফলতার পেছনে আমার টিমের কৃতিত্বও অনেক।বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকে আমার এই টিমের সদস্য সংখ্যা ২২,০০০(বাইশ হাজার)। এইসব ব্যাংকাররাই এই ব্যাংক তথা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

■ডেইলি স্টারঃ এমন একটা সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে, বাংলাদেশীরা প্রকৃতিগতভাবেই আত্মকেন্দ্রিক বা ঘরকুনো।আপনি কি মনে করেন এই ধারণাটা আদৌ সত্য? অথবা এই মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে আসীন হয়ে আপনি নিজেই সে ধারণা পাল্টে দিয়েছেন?

আবরার এ. আনোয়ারঃ একচ্যুয়েলি, আমি মনে করি আমাদের সবচেয়ে বড় চেলেঞ্জ হচ্ছে লিডারশীপ বা নেতৃত্ব, যেটা আমাদের পতিষ্ঠানের প্রতিটা স্তরে গড়ে তোলা অতীব প্রয়োজন। অতীতে মানুষের ধারণা ছিল “অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন একজন নতুন লিডার, বিদ্যমান লিডারের জন্য হুমকিস্বরূপ”। আমাদের দর্শন কিন্তু ঠিক তার বিপরীত।আমরা বেশি বেশি অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন লিডার অন্বেষণ করতে চাই যাঁরা বর্তমান লিডারদের স্থলাভিষিক্ত হবেন, এবং কেবল তখনই প্রতিষ্ঠানের প্রোডাক্টিভিটি (উৎপাদনশীলতা) বৃদ্ধি পাবে। আপনার টিম মেম্বাররা কীভাবে বেড়ে ওঠছে একজন নেতা হিসেবে সেদিকে লক্ষ্য রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পৃথিবীতে কেউই অপরিহার্য্ নয়। প্রত্যেককেই সাফল্য-মন্ডিত হয়ে বেড়ে ওঠার জন্য একটা সুযোগ দিতে হবে। তাই আমি সকল লিডার কে পরামর্শ দিব যেন কর্ম-জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের টিম মেম্বারদেরকে সাফল্য-মন্ডিত হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়। কারণ দিন শেষে আপনি একা সত্যিকার-অর্থে কোন কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।

Related Post

■ডেইলি স্টারঃ আপনার ২৬ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ার।বাংলা
দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

আবরার এ. আনোয়ারঃ আমি মনে করি বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পর্যন্ত ভাল অবস্থায় আছে। আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির সুস্থিতি বিদ্যমান এবং বাংলাদেশের GDP প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছরই সন্তোষজনক। আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার, পাওয়ার, এনার্জি জেনারেশন, ডমেস্টিক কঞ্জাম্পশন এবং পার-ক্যাপিটা ইনকামে অগ্রগতি হচ্ছে।কিন্তু সামনের দিকে এগুতে হলে আমদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে আরো বেশি উন্নতিসাধন দরকার। বৈশ্বিক এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন জনিত বাঁধাগুলো দূর করতে হলে আমাদেরকে আরো স্থিতিস্থাপক হতে হবে। বাংলাদেশের মত দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে রপ্তানী, রেমিটেন্স, রপ্তানীর বহুমূখীতা এবং খারাপ ঋণ এর মত অসংখ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি এইসব চ্যালেঞ্জ দূর করা যায় তবে ভবিষ্যত তরুন প্রজন্ম এই দেশের অর্থনীতিকে তথা এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

■ডেইলি স্টারঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কীভাবে সম্ভবপর হয়ে ওঠতে পারে বলে মনে করেন?

আবরার এ. আনোয়ারঃ এজন্য তরুন প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিরূপে গড়ে তোলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দিকে নজর দিতে হবে। এমন কি যারা মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার হিসেবে বিদেশ যায় তারাও কিন্তু রাজস্ব বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। পাশাপাশি তরুনরা বেকার না থেকে দেশের ভেতরে যেন চাকরি খুঁজে নিতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টি করা অমাদের দরকার। বাংলাদেশীরা কঠোর পরিশ্রম করতে সক্ষম, আমাদের প্রয়োজন এইসব নিজস্ব কর্মঠ লোকদের জন্য বিপুল সুযোগ সৃষ্টি করা যেন তারা এখানে সফলকাম হতে পারে।আমি তো এখন আফসুস করি এই জন্য যে, আমি কেন আজ হতে পঁচিশ বছর আগে জন্মগ্রহন করলাম না!কারণ এখানে অলরেডি বর্তমান প্রজন্মের তরুনদের জন্য এমন অনেক সুযোগ রয়েছে যা আমরা পাইনি এবং ভবিষ্যতেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অবিশ্বাস্য সব সুযোগ-সুবিধা। তরুনদের উচিত এইসব প্রত্যাশিত সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাহস এবং ধৈর্যের সাথে অগ্রসর হওয়া।

■ডেইলি স্টারঃ পেশায় ব্যাংকার হওয়া সত্বেও আপনাকে সবাই সংস্কৃতি-হিথৈষী হিসেবে জানে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।

আবরার এ. আনোয়ারঃ সংস্কৃতির প্রতি আমার ভালবাসা সবসময়ই ছিল এবং আছে। আমি গান শুনতে এবং ড্রামা-সিরিয়াল দেখতে পছন্দ করি। মানুষ শুধু কাজের মধ্যে ডুবে থাকবে এটা আমি মনে করি না। সংস্কৃতি ও সামাজিকতা-এ দু’এ মিলেই মানুষ যা না হলে আমরা মেশিনে পরিনত হতাম । আমি সবসময় সংস্কৃতির সমর্থন এবং অনুশীলন করি। এটার পরিচর্যা ছাড়া কোন সমাজ টিকে থাকতে পারে না।

■ডেইলি স্টারঃ একজন সফল ব্যাংকার হওয়ার জন্য কোন কোন বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন?

আবরার এ. আনোয়ারঃ প্রথম যেটা দরকার সেটা হল সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হবে, শেখা এবং তথ্য-ভান্ডার সমৃদ্ধির প্রতি আগ্রহ কখনো বন্ধ করা যাবে না, পাশাপাশি আপনাকে আন্তরিক হতে হবে, হতে হবে ফোকাসড, আপনার টিমের প্রতি আপনার আচরণ অবশ্যই শ্রদ্ধাপূর্ণ হতে হবে, সফলতার নিশ্চয়তা দিয়ে তাদেরকে নিয়ে সামনের দিকে এগুতে হবে। স্টেইকহোল্ডার, ক্লায়েন্ট-কাস্টমারদের প্রতিও আপনাকে সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। প্রত্যেক টিম মেম্বারকে বিকশিত হওয়ার সুযোগদানের মাধ্যমে সামষ্টিক সফলতার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। নতুনদের জন্য আমি বলব আপনার বিকশিত হওয়ার দিকে নজর দিন, আপনার যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন। তরুন উদ্যোক্তাদের এইটা মনে রাখতে হবে যে, নতুন কিছু শুরু করা আসলেই কঠিন এবং তা আপনাকে হতাশার দিকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কখনো হতাশাকে আপনার শরীর ও মনে প্রভাব ফেলতে দিবেন না। সবকিছুকে সহজরূপেই নিন এবং সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করুন। এভাবেই একদিন আপনি শীঘ্রই সফলতার শিখরে পৌছে যাবেন।

Recent Posts

  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

বাঁশখালীর ৭৪০ অসহায় পরিবারে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- করোনা মহামারীর কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া বাঁশখালীর ৭৪০ অসহায় পরিবারে উপজেলা প্রশাসনের…

12 hours ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

বাহারছড়ায় অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর বাহারছড়ায় অসহায় মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার সামগ্রী বিতরণ করা…

15 hours ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

সরলে অসহায়দের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের অসহায় মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার সামগ্রী বিতরণ…

16 hours ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫ শ্রমিক নিহত, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ২ মামলা

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর গন্ডামারায় পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় বাঁশখালী থানায় দুটি মামলা হয়েছে।…

21 hours ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

গন্ডামারায় সংঘর্ষের ঘটনায় দুই তদন্ত কমিটি, অনুদানের ঘোষণা

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী টাইমস- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এস আলম পাওয়ার প্লান্টে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা প্রশাসন…

2 days ago
  • সারা বাঁশখালী
  • গন্ডামারা
  • শীর্ষসংবাদ

ফের রক্তাক্ত গন্ডামারা, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে সংঘর্ষ, নিহত ৫

চট্টগ্রাম: আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গন্ডামারা। এস আলম ও চায়না সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিতব্য কয়লা…

2 days ago