বাঁশখালীর ঐতিহ্যবাহী জলকদর খাল: সম্ভাবনার নতুন দ্বার

ওয়াসিম আহমেদ : চট্টগ্রামের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উপজেলা হলো বাঁশখালী ( Banshkhali ) । পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত ১৫০ বর্গমাইলের এই উপজেলার ঐতিহ্যের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে জলকদর খাল।

খানখানাবাদের ( Khankhanabad ) উত্তর সীমান্তে ঈশ্বরবাবুর হাট ( Issorbabur Hat ) পয়েন্ট ও রাতারকুল ( Ratarkul ) গ্রামের জেলেপাড়া ঘেঁষে জলকদর শংখ নদীতে মিলিত হয়েছে। মোহনাটি লোকালয়ে কুঁরিচোরা ঘাট নামে পরিচিত। এর পূর্বপাশে রাতাখোর্দ্দ গ্রাম ছিলো, যা শংখের ভাঙ্গনে অাজ বিলীন। তাছাড়াও মোহনার উত্তর পাশে শংখের ওপারে অানোয়ারার জুইদন্ডীর গ্রামের অবস্থান।

উত্তরে কুঁরিচোরা ঘাট থেকে শুরু হয়ে প্রায় ৩০কি.মি দীর্ঘ এই জলকদর বাঁশখালীকে দু’ভাগে বিভক্ত করে গন্ডামারা থেকে একটি ধারা খাটখালী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। খাটখালী ঘাটের দক্ষিণ পাশে ছনুয়া ( Chonua ) ও উত্তরপাশে গন্ডামারার ( Gondamara ) অবস্থান এবং মোহনার বিপরীত পাশে রয়েছে কুতুবদিয়া দ্বীপ।অন্যধারাটি গন্ডামারা থেকে পূর্বদক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে পেকুয়ার বারবাকিয়ার দিকে চলমান।

জলকদর খাল দ্বারা বিভক্ত বাঁশখালীর পশ্চিমে রয়েছে খানখানাবাদ ( Khankhanabad ), বাহারছড়া (Baharchora ), গন্ডামারা ( Gondamara ) ও ছনুয়া ( Chonua ) ইউনিয়ন। যে এলাকাটি পশ্চিম বাঁশখালী ( West Banshkhali ) নামে পরিচিত। এর অারো পশ্চিমে রয়েছে সমুদ্র। কোথাও ঘাসঘেরা অনাবাদি জমি, লবণ মাট অাবার কোথাও সমুদ্রতীরের সারি সারি ঝাউ বাগানের বিশালতায় পরিবেষ্টিত বাঁশখালীর পশ্চিম পাশটা। খালটির পূর্বপাশে ঘেঁষে সাধনপুর ( Sadhonpur ), কাথারিয়া ( Kathoria ), সরল ( Sorol ), শীলকূপ ( Shilkup ) ও শেখেরখিল ( Shekherkhil ) ইউনিয়নের অবস্থান।

যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নতার কালে বাঁশখালী ( Banshkhali ) , কুতুবদিয়া, চকরিয়া ও মহেশখালীর মানুষ লঞ্চ-স্টিমার যোগে জলকদর হয়ে শংখ পেরিয়ে চানখালী (শংখ ও কর্নফুলীর সংযোগস্থল) দিয়ে কর্ণফুলীর ওপারে তথা চট্টগ্রাম শহরের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। হয়তো এই ঐতিহ্য এখন অার জলকদরের নাই, তবুও মালবাহী ও লবণের সাম্পান এবং বাঁশের পাল এখনো চলমান জলকদরের বুক জুড়ে।

ষাট দশকের দিকে কবি অাল মাহমুদ সাম্পান যোগে চাক্তাই থেকে শংখ-জলকদর হয়ে কুতুবদিয়া যাওয়ার কালে “অাকাশ নিয়ে” কবিতায় লিখেন,
“জল কদরের খাল পেরিয়ে জল পায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ্য রেখে শঙ্খ নদীর বাঁক
মন হয়ে যায় পাখি তখন মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলের জন্য মিষ্টি হাওয়ার বেগ।”

Related Post

খালের বর্তমান অবস্তা অবলোকনে সরেজমিনে দেখা যায়, চৌধুরীহাট ( Chowdhury Hat ) থেকে করিম বাজার ( Karim Bazar ) পর্যন্ত খাল একটু ভরে গেছে, প্রায় ৫০-৬০ফুট প্রস্থ বহন করে। বাকিসব জায়গায় গড়ে ১০০-১৫০ ফুট প্রস্থ বহন করে। খালের উপর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কালভার্ট পরিলক্ষিত হয়। এগুলো হলো রাতারকুল ( Ratarkul ), মোশারফ অালী হাট ( Mosarrof Ali Hat ), বশিরউল্লাহ মিয়াজির হাট ( Boshir Ullah Miazi Hat ), চুনতি মনছপ বাজার ( Chunoti Monchop Bazar ), সরল ( Sorl ), গন্ডামারা ( Gondamara ) ও বাংলাবাজারে ( Banglabazar) অবস্থিত।

একটু পেছনে তাকালে অামরা দেখি, ২৯ এপ্রিল ১৯৯১ সালের পূর্বে এই খালের উপর কোনো ব্রীজ বা কালভার্ট ছিলো না, যা ছিলো বাঁশের তৈরী সাঁকো মাত্র। যার কারনেই অনেকটা দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন ছিলো পশ্চিম বাঁশখালী ( West Banshkhali )।একানব্বই’র প্রলয়ংকারী ঘূর্নিঝড়ে সবচেয়ে বেশী মানুষ মারা যায় পশ্চিম বাঁশখালীতে।কেননা পূর্ব বাঁশখালী ( East Banshkhali ) সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থাই ছিলো নামমাত্র। এই জলকদরই সাক্ষী হাজারো মানুষের ভাসমান দেহের।

এই ঐতিহ্যবাহী জলকদরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে, এই খালই হতে পারে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার। পূর্বের পাহাড় শ্রেনি থেকে অনেক ছড়া এই খালের সাথে মিলিত হয়েছে। তার মধ্যে কুমিরা ছড়া, কোদালা, সোনাইছড়ি, বরইতলী, জালিয়া খালী, চাম্বল খাল, নাপোরা খাল ও পুঁইছড়ি খাল উল্লেখযোগ্য। এ থেকে বুঝা যায় খালটির পানির উৎস হলো পাহাড়শ্রেনি; অাবার খালে তেমন স্রোতও নেই। অনেকটা স্থির জলাশয় বলা যায়।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে খালের দুপাশে সুইসগেইট যোগে বাঁধ ও সংস্কার করলে খালটি মৎস্য প্রকল্পে অানা যায়। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগের সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিম বাঁশখালীর লবণ পানির প্রভাবে অনাবাদি থাকা শত শত একর জমিকে অাবাদি করে ধান, শাক-সবজি ও রবিশস্য উৎপাদন করা সম্ভব। অার এই প্রকল্পটি শুধু বাঁশখালীর অর্থনীতি নয়, জাতীয় পর্যায়ও এক অসাধারণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

এছাড়াও খালের প্রকল্প সার্থক হলে, স্বাভাবিকভাবে পশ্চিম বাঁশখালীর অবকাঠামো উন্নত হবে। অার পর্যটন সুবিধা, নিরাপত্তা ও সঠিক পরিচর্যা পূর্বক বাঁধ প্রকল্প শেষে মেরিন ড্রাইভ রোড বাস্তাবায়ন হলে খুব দূরে নয় জল কদরের তীর বা পশ্চিম বাঁশখালীই হবে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

View Comments

Recent Posts

  • প্রেস বিজ্ঞপ্তি
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

বাঁশখালীতে কোরআনের তাফসীর বিতরণ ও ফ্রি কোরআন শিক্ষা কোর্স চালু

বাঁশখালী স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাঁশখালীর শীলকূপ ইউনিয়নে পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে এক মাস ব্যাপী…

3 hours ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

বাঁশখালীর ৭৪০ অসহায় পরিবারে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- করোনা মহামারীর কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া বাঁশখালীর ৭৪০ অসহায় পরিবারে উপজেলা প্রশাসনের…

2 days ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

বাহারছড়ায় অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর বাহারছড়ায় অসহায় মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার সামগ্রী বিতরণ করা…

2 days ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

সরলে অসহায়দের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার বিতরণ

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নের অসহায় মানুষের মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার সামগ্রী বিতরণ…

2 days ago
  • সারা বাঁশখালী
  • শীর্ষসংবাদ

কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫ শ্রমিক নিহত, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় ২ মামলা

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী- বাঁশখালীর গন্ডামারায় পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে পাঁচজন নিহতের ঘটনায় বাঁশখালী থানায় দুটি মামলা হয়েছে।…

2 days ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

গন্ডামারায় সংঘর্ষের ঘটনায় দুই তদন্ত কমিটি, অনুদানের ঘোষণা

তাফহীমুল ইসলাম, বাঁশখালী টাইমস- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এস আলম পাওয়ার প্লান্টে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা প্রশাসন…

3 days ago