বাঁশখালীতে ত্রাণকর্তার ত্রাণকর্মের ত্রাণোৎসব

BanshkhaliTimesবাঁশখালীতে ত্রাণকর্তার ত্রাণকর্মের ত্রাণোৎসব
আবু ওবাইদা আরাফাত

অমুকের নির্দেশে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে, তমুকের নির্দেশে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে, হাজার হাজার শত শত পরিবারকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজ হাতে বিতরণ করলেন অমুক আর তমুক। কিন্তু সরকারি তহবিলের ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়েও সরকারি তহবিল উল্লেখ করতে অনেকের মাঝে লজ্জা দেখা গেছে। লজ্জা মানুষের অলঙ্কার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে উক্ত অলঙ্কার স্রেফ ভন্ডামি। সরলে না খেয়ে আত্মহত্যা করে যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর এ দুঃসংবাদ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও দেখা গেছে। খোদ এমপির এলাকার চিত্র এটি।

এই দুর্যোগে এমপি মহোদয় বাঁশখালীবাসীর জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা রেখে গেলেও দুর্ভাগা বাঁশখাইল্ল্যারা তা থেকে মোটেও শিক্ষা নেননি। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে ‘নির্দেশ’ দিয়ে সারা বাঁশখালীতে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা যায়, দেখিয়ে দিলেন কিভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শহরে অবস্থান করেও দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা যায়৷ তিনি পুরো সংসদীয় আসন তত্ত্বাবধান করছেন দূর থেকে অথচ গ্রামের মানুষ আবুল বিড়িতে টান মারার লোভেও চায়ের দোকানের আড্ডা হতে বিরত থাকতে পারেনি। আমি মনে করি, এমপি মহোদয় সশরীরে ত্রাণ দিতে এলে ছবিপাগল নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্যে যে জনসমাগম সৃষ্টি হতো এতে করোনার সংক্রমণ আশঙ্কা নিঃসন্দেহে বেড়ে যেত। তবে এরমধ্যে সশরীরে এসে জনসমাগম এড়িয়ে দফায় দফায় ত্রাণ বিতরণ করে সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়ে নিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়।

তবু নির্দেশ আর সশরীরে উপস্থিতির ফাঁকফোকর ইতোমধ্যে বাঁশখালীবাসী টাহর করতে পেরেছেন খুব ভালো করেই। বিতরণ করা মাত্র সাংবাদিক ডেকে পত্রিকায় ছাপাতে দেরি নেই। ব্যক্তিগত তহবিল আর বিতরণকৃত পরিবারের ‘সংখ্যার অঙ্ক’ নিয়ে বড়াই করে সমাজপতি সাজতে দেরি নেই। পরক্ষণে সংবাদের লিংকের নিচে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীদের মন্তব্য আমাদের হতাশ করে দেয়। কারো অভিযোগ চালে ওজনে কম দেয়া, কারো অভিযোগ বিতরণকৃত পরিবারের সংখ্যা নিয়ে, কারো অভিযোগ তহবিলের নামকরণ নিয়ে। অনেকের অভিযোগ ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি, স্বদলপ্রীতি ও ধর্মবৈষম্য এবং কারো কারো অভিযোগ তাদের এলাকায় কোন ত্রাণই পৌঁছেনি!
এসব দেখে আমরা বিব্রত হই। আফসোস হয়- অভিযুক্ত তথাকথিত জনপ্রতিনিধিদের কি আদৌ এসব গরীবের হক্ব মেরে খাওয়ার মতো অভাব আছে? তারা কি এতই অভাবী? আসলে তাদের কেবল সততার অভাব। এসব দেখে কিছু রসিক জনতা বলে বসলেন কতটা স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত হলে ক্ষমতায় থেকেও পেটের ক্ষুধায় পরের চালে জাল ফেলতে হয়। তাদের চোখে এটা নিচক চাল নিয়ে চালবাজি নয় বরং বেঁচে থাকার সংগ্রামে জনতার গাল উপেক্ষা করে গালে চাল চালান দেয়ার অনিবার্য নিয়তি।

জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাবর্গ ও সামাজিক সংগঠনসমূহ অধিকাংশই ত্রাণ বিতরণের বেলায় সামাজিক দূরত্বকে গুরুত্ব দেননি। কয়েক’শ কিংবা হাজার টাকার ত্রাণের থলে নিতে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে গেলো বাঁশখালীর হাজার হাজার মানুষ। কিছু কিছু দানবীরের ত্রাণের পলিথিনে মোড়া হালকা পোটলা ভিক্ষুককেও লজ্জায় ফেলে দিবে। ত্রাণকর্তারা হয়তো ভুলে গেছেন এটা ভিক্ষা নয়, মানুষ হিসেবে পাশে থাকা। প্রতিটি সচ্ছল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব অসচ্ছল পরিবারকে সহযোগিতা করা। জাতীয় দুর্যোগে দুইদিন পর কার পরিণতি কোথায় গিয়ে গড়ায় তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানার উপায় নেই। আজ যিনি হাসিমুখে ত্রাণ বিলাচ্ছেন কাল যে তাকে মলিনমুখে ত্রাণ নিতে হবেনা সে গ্যারান্টিও নেই।

এতক্ষণ পড়লেন ত্রাণকর্তাদের ত্রাণকর্মের মহোৎসব তথা ত্রাণোৎসব। এ কাজটি খুব সহজেই স্বচ্ছতার সাথে করা যেত যদি প্রত্যেক ওয়ার্ডের মেম্বারগণ ত্রাণপ্রাপ্তদের নাম হালনাগাদ ও তা প্রকাশ করার ব্যবস্থা করতো। ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে ইউএনও মহোদয়ের উদ্যোগে হেল্পলাইন চালু করলে দারুণভাবে প্রভাব ফেলতো। এখনও সময় আছে প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধি ও ডিলারদের তালিকা করে তাদের কৃতকর্ম নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সারা দেশে লকডাউন আরও দুই মাস দীর্ঘায়িত হবে। আরও অনেকবার হয়তো সরকারি বরাদ্দ আসবে, সামনে থেকে এসব ত্রাণের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখন থেকে ভাবার বিকল্প নেই।

বাঁশখালীর মানুষের জন্য আল্লাহ না করুক ভয়াবহ দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। যৌথবাহিনী ও প্রশাসনের সাথে বাঁশখালীর মানুষ রীতিমতো চোর ডাকাত পুলিশ খেলা খেলে আসছে প্রায় একমাস ধরে। কতটা অবিবেচক, অজ্ঞ ও মূর্খ হলে নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রশাসনকে সাবধান করতে হয়, একশানে যেতে হয়। কতটা নির্লজ্জ সম্প্রদায় হলে মানুষকে মৃত্যুরোগ থেকে সাবধান করতে আসা যৌথবাহিনীর সাথে লুকোচুরি খেলা যায়। মানুষকে ঘরে ঢুকানোর জন্য কেবল পায়ে ধরাটা বাকি ছিল প্রশাসনের। এসবেও মানুষ সোচ্চার না হওয়ায় স্থানীয় তরুণরা মিলে এলাকাবাসীকে সচেতন করতে যেই মাঠে নামলেন তাতেও শুরু হয়ে গেল ঐতিহাসিক দলীয় কাদা ছুটাছুটি। চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে কেউ কেউ নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তরুণদের উদ্যোগকে মাঠ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার মতো সমাজঘাতি পদক্ষেপের কথাও শুনা গেছে।

এই চতুর্মাত্রিক নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে করোনা পরিস্থিতিকে দিনদিন স্বাগত জানানো হচ্ছে বাঁশখালীতে। ঠিক এই মুহূর্ত হতে যাদের জেগে উঠার তারা না জাগলে, যাদের চেতন হবার কথা তারা চেতনা হারিয়ে অসচেতনার ভাণ ধরে বসে থাকলে ঘোর অমানিশা অপেক্ষা করছে। যে আঁধারের কালো দূর করার যথেষ্ট আলোও হয়তো তখন আমাদের হাতে থাকবে না।
দয়া করে সবাই ঘরে থাকুন, আপনি ঘরে থাকলে বেঁচে যাবে আপনার পরিবার, সমাজ ও দেশ।

লেখক: সম্পাদক, বাঁশখালী টাইমস

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.