নিরাপদ সড়ক চাই || জালাল উদ্দিন ইমন

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে গাড়ির সংখ্যা যে বেড়েছে সে হারে দক্ষ চালক তৈরি হয়নি। অদক্ষ ও প্রশিক্ষণবিহীণ চালক দ্বারা গাড়ি ড্রাইভিং করার জন্য অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
♦ গাড়ি চালানোর জন্য যে সব আইন ও নিয়মনীতি রয়েছে তাও অধিকাংশ ড্রাইভার জানেনা। এ কারণে তারা কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে থেকেন। বাংলাদেশে এখন অনেক ক্ষেত্রে কম বেতনে সনদবিহীন। চালক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব চালকরা অধিকাংশই তরুণ বয়সের। যারা রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অন্য গাড়িকে ওভারটেক করে এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে থাকে তারা। এ কারণে প্রতিদিনই অহরহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকছে।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব পারিবারিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক মারাত্মক যা আবার বহু সমস্যার জন্মদাতা।
হাইওয়ে পুলিশ বিভাগের প্রকাশিত প্রতিবেদনে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিদের ২৪% লোকের বয়স ১৫ বছরের নিচে এবং ৩৯% লোকের বয়স ১৬-৫০ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা কেন্দ্রের গবেষণা ফলাফলে দেখা যায় যে। বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান শিকার হচ্ছেন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনায় আহত কিংবা নিহত হওয়ার ফলে এসব পরিবারের সদস্যদের দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। এবং আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন ও পরিবারের শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
♦ অনেক সময় দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তি শারীরিক পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যা ব্যক্তির জীবনকে ভারসাম্যহীন করে তোলে। মানসিক ভারসাম্যহীনতা ব্যক্তিকে জীবনে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এ সমস্যা কোনকোন ক্ষেত্রে ভিক্ষাবৃত্তির মতো পেশা গ্রহণ করে। আবার কেউকেউ জীবন নির্বাহের জন্য অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। চরম হতাশা লাঘবে অনেকে আবার মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু পারিবারিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেনা,আর্থ সামাজিক ও মানসিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

♦ পথচারীরা প্রায়ই সড়ক ব্যবহার করার নিয়মনীতি জানেনা। রাস্তার কোন পাশে চলাফেরা করতে হয়। কখন রাস্তা পার করতে হবে, প্রভৃতি অজ্ঞতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। উদাসীনভাবে ব্যক্তি, শিশু, বৃদ্ধ, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন অন্যমনস্ক ও উদাসীনতা একসময় দুর্ঘটনা ঘটায়। রাস্তার ওপর হাট-বাজার স্থাপন,মহাসড়কে ধান,পাট,মরিচ,শুখানো গরু ছাগল বেধে রাখা, একই রাস্তা গাড়ি ও অযান্ত্রিক যান, স্টিলবেল্ট ব্যবহার না করা হেলমেট ব্যবহার ব্যবহার না করা। অধিক রাতে গাড়ি চালানো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারও কারও দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা এ অনীহার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ ছাড়া কোন কোন নকশা নির্মাণে ও ত্রুটিপূর্ণ রয়ে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার এবং কন্ট্রাক্টরের কাজে উদাসীনতা এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি এ সমস্যার জন্য দায়ী।

♦ নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আমরা অন্তত ৫০% নিরাপদ ও দুর্ঘটনামুক্ত রাখতে পারবো।

১. গাড়ির চালককে ট্রাফিক আইন কানুন ও নিয়মনীতি শৃঙ্খলা মেনে গাড়ি চালাতে উদ্বুদ্ধ করা এবং সাইড, সিগন্যাল, গতি মেনে সতর্কতার সাথে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করা।
২. বেপরোয়া ও নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি না চালানো, গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল পরিবহণ না করা, অন্য গাড়িকে ওভারটেকিং না করার বিষয়ে চালকদের উৎসাহিত করা এবং আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করা।
৩. ভারী যান চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা, সকল সিগন্যাল পয়েন্টে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল স্থাপন করা, আধুনিক ও মানসম্মত ড্রাইভিং ইন্সটিটিউট স্থাপন করা, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা,কালভার্ট ব্রীজ, সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করে নিরাপদ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৪. গাড়ির ছাদে যাত্রী এবং মাত্রাতিরিক্ত মালবহন না করা, প্রতিযোগিতা করে গাড়ি না চালানো রাস্তায় গাড়ি বের করার আগে যান্ত্রিক ত্রুটি পরীক্ষা করে বের করা। প্রভৃতি বিষয়ে সচেতন ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৫. আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দায়িত্ব পালনে সচেতন করা।
৬. জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে প্রচার মাধ্যমকে ভুমিকা পালনে উৎসাহিত করা।
৭. দূর্পাল্লার সড়কের পাশে বাড়িঘর তৈরি ও হাট বাজার স্থাপন না করা তা ছাড়া ধান পাট মরিচ ইত্যাদি না শুকানো এবং গরু ছাগল না বাঁধা।
৮. ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বশীল হওয়া, এবং ভুয়া লাইসেন্সধারী যাতে রাস্তায় গাড়ি চালাতে না পারে সে ব্যাপারে কার্যকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯. রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এলকোহল গ্রহণকারী গাড়ি চালকদের শনাক্তকরণ করা। এবং সেই সব মাতালদের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা।

লেখক: জালাল উদ্দিন ইমন
শেখেরখীল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *