দুর্গম অরণ্যেও প্রাণোচ্ছল, বাঁশখালীর মেয়ে সুপর্ণা

দুর্গম অরণ্যেও প্রাণোচ্ছল, বাঁশখালীর মেয়ে সুপর্ণা

BanshkhaliTimes

দিলুয়ারা আক্তার ভাবনা, বাঁশখালী টাইমস: পরিবার, সংসার ও কর্মক্ষেত্রে নিজের মেধা ও যোগ্যতার সাক্ষর রেখে পূর্ণ করেছেন স্বপ্নের ষোলকলা। সীমাবদ্ধতা জয় করে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

বলছিলাম বাঁশখালীর মেয়ে ডা. সুপর্ণা দে সিম্পু’র কথা। ৩৫ তম বিসিএসে সন্তান প্রসবের দিনই রিটেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন এই নারী। তিনি ২০১৭ সালে ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বর্তমানে উক্ত উপজেলার ভেটেরিনারি সার্জনের পাশাপাশি ‘ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবেও কর্মরত আছেন।

BanshkhaliTimes
বাইক চালিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অফিস করেন সুপর্ণা দে

তাঁর জন্ম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার জলদি পৌরসভায়। তিনি স্কুল শিক্ষক স্বপনেন্দু দে ও অর্পনা নন্দী’র প্রথম সন্তান। বাঁশখালী গার্লস স্কুল থেকে ২০০৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে – ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) ডিগ্রী অর্জন করেন।

BanshkhaliTimes

দুই সন্তানের জননী এই নারী ঘর-সংসার সামলিয়ে বিগত চার বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সরকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। লক্ষীছড়ি উপজেলার মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এমন দৃষ্টান্ত রীতিমতো হতবাক করে। যেখানে যানবাহন বলতে মোটরবাইক-ই একমাত্র ভরসা। এই অদম্য নারী বাইকে যাতায়াতের মাধ্যমে তাঁর সমস্ত অফিসিয়াল কার্যক্রম সম্পাদন করেন। উল্লেখ্য, লক্ষীছড়ি উপজেলায় এই পেশায় ১৯৮৩ সাল থেকে কোনো মহিলা কর্মকর্তা যোগদান করেননি, তিনিই প্রথম কর্মকর্তা যিনি এতো দীর্ঘ সময়কাল ধরে এই উপজেলায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। উক্ত উপজেলার ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান এর হৃদ্যতা, সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা তাঁর কাজের গতি বাড়ায়। এবং এই করোনাকালীন দূঃসময়েও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কোনো কাজই থেমে নেই। দুর্গম অঞ্চলে কাজ করার অসুবিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি নভেরা প্রতিবেদককে জানান, ‘স্বভাবতই এমন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যে কেউই বেশিদিন কাজ করতে চান না। কিন্তু সবাই যদি সুবিধার পিছনে ছুটে এসব অঞ্চল আরও বেশি পিছিয়ে পড়বে। আমি এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে দৃষ্টান্তমূলক কিছু করে যেতে চাই।’

BanshkhaliTimes

অসামান্য কর্মদক্ষতায় লক্ষীছড়ি উপজেলায় ইতোমধ্যে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন এই দুঃসাহসী মহিলা কর্মকর্তা। উঁচুনিচু পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে খামার পরিদর্শন, পশু ভ্যাকসিনেশন, প্রজেক্ট বাস্তবায়ন, কৃত্রিম প্রজননসহ খামারিদের প্রয়োজনে ছুটে যাচ্ছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। সম্প্রতি Lean Project এর ‘দেশি মুরগী’র জাত উন্নয়ন প্রকল্প ও গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। একটি লাইভস্টক অফিসে যেখানে ১১ জন কর্মী থাকার কথা সেখানে ৪ জন মাত্র কর্মী নিয়ে দক্ষ হাতে সমস্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। দিন থেকে দিনে লক্ষীছড়ির প্রান্তিক মানুষের ডান হাতে পরিণত হচ্ছেন। পাহাড়ী অঞ্চলের সাথে নিজেকে মিশিয়ে তিনি যেন নিত্যদিনই দুর্দমনীয় হয়ে উঠছেন নতুন উদ্যমে, নতুন প্রেরণায়।

প্রাণিসম্পদ ক্যাডার ডা. সুপর্ণা দে সিম্পু’র রয়েছে গর্ব করার মতো দারুণ কিছু ব্যক্তিগত অর্জন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের “মহিলা অধিদপ্তর” কর্তৃক আয়োজিত “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” কার্যক্রমে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার অর্জন করেন। উল্লেখ্য তিনি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে চূড়ান্ত ভাবে জাতীয় পর্যায়ে ‘জয়িতা’ নির্বাচিত হয়ে সারা বাংলাদেশে বাঁশখালীর নাম উজ্জ্বল করেছেন। ৫ ক্যাটাগরির মধ্যে ‘শিক্ষা ও চাকুরি’ ক্ষেত্রে অসমান্য অবদান এবং সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নিজের হাতে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’র পুরস্কার তুলে দেন। এছাড়াও বিসিএস বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে মেধাতালিকায় তৃতীয় হওয়ায় “University Putra Malaysia” তে ১২ দিনের ট্রেইনিংয়ের সুযোগ পান তিনি। FAO (Food and Agricultural Organisation) এর লাইভস্টক অফিসার্স ট্রেইনারের ৪জন নারী প্রশিক্ষকের মধ্যেও তিনি অন্যতম।

“সংসার বনাম চাকুরি নিয়ে” তিনি জানান- সংসার, স্বামী, সন্তান কখনও ক্যারিয়ারের পথে বাঁধা হতে পারে না। কেননা অনার্স প্রথম বর্ষে থাকাকালীন বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। আগ্রহ ও স্বামীর উৎসাহের জেরে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সমস্যা হয়নি তেমন। কিন্তু লোকেদের কটুকথা মর্মাহত করেছে বারবার। এইসব কটুক্তি তাঁকে স্বপ্নপূরণে জেদি করে তুলেছে বরং। মাস্টার্সে পড়াকালীন তিনি ১ম সন্তানের মা হন। বিয়ের ১০ বছর পর দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের দিনই বিসিএস রিটেনে অংশগ্রহণ করেন এবং সেবারেই সফলতা অর্জন করেন। নিয়োগের পর থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এই সুদীর্ঘ যাত্রায় তিনি কখনও সন্তান-সংসারের অজুহাত দিয়ে কোনো কাজে অবহেলা করেননি। এগুলোই বরং তাঁকে সাহস জুগিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, অনুপ্রাণিত করেছে।

তাঁর ভাষায়, ‘মেয়েরা যেমন কোমলমতি মা হয়ে সংসার আগলে রাখতে পারে, তেমনি দক্ষ অফিসার হয়ে কঠোর হাতে অফিসও সামলাতে পারে। মেয়েদের আসলে পারতে হয়!’

লেখক: সহ সম্পাদক, নভেরা, বাঁশখালী টাইমস
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.