জলকদর সাহিত্য আয়োজন || সে এবং তার স্মৃতি

সে এবং তার স্মৃতি

নাফীছাহ্ ইফফাত

তখন আমরা একটা কাছারিঘরে প্রাইভেট পড়তাম। দেয়ালগুলো ছিল পাকা, মেঝে ছিল মাটির। কয়েকটা বেঞ্চ ছিল, একটা বোর্ড। আর সামনে পেছনে দুটো জানালা। ঘরটার চারপাশে ছিল গাছগাছালিতে ভরপুর। গাছপালার মাঝখানে দুরন্ত বাতাসের মধ্যে আমরা পড়তাম। আমি মাঝেমাঝে উদাস হয়ে জানালায় তাকিয়ে থাকতাম।

একদিন জানালায় তাকাতেই দেখি,
গ্রামের ইটের তৈরী রাস্তা দিয়ে কেউ একজন তার উস্কোখুস্কো খাঁড়া চুলে হাত চালাতে চালাতে আপনমনে হাঁটছে। হলুদ শার্ট, ব্ল্যাক জিন্স, পায়ে স্যান্ডেল, মাথায় এলোমেলো চুল। সোজা হাঁটলে হয়তো তাকে আমি খেয়ালও করতাম না। সে একবার হেঁটে যাচ্ছিলো তো আবার ফিরে আসছিল। তার হয়তো মেঘাচ্ছন্ন সেই বিকেলে খোলা আকাশের নিচে হাঁটতে ইচ্ছে করছিল। তাই সে আনমনে পায়চারি করছিল। আর এদিকে জানালায় আমি মুগ্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছি। অবাক হয়ে যাচ্ছি তার হাঁটা দেখে। এত সুন্দর কেন তার হাঁটা? হাঁটতে হাঁটতে সে একটা পাথরে জোরে লাথি দিল, পাথরটা পাশেই ধানখেতের পানিতে টুপ করে পড়ে গেলো। সে আবার খাড়া চুলে হাত চালাতে লাগলো আর উদাস মনে পায়চারি করতে লাগলো।

স্যারের ধমকে ক্লাসে ফিরে আসলাম। কিন্তু মনটা পড়ে রইলো সেই অচেনা উস্কোখুস্কো চুলের সেই নিঁখুত বালকটার ওপর। সেদিনের মতো ক্লাস শেষ করে ফিরে আসলাম।

পরদিন আগেভাগেই ক্লাসে চলে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও সেই অচেনা বালকের দেখা আর মিললো না। এদিকে ছুটির সময় হয়ে আসছে। তখনই হঠাৎ তার দেখা। ইস! সে ধূসর বাদামি একটা শার্ট পরে আছে আজকে। কি যে সুন্দর লাগছে। আমি তাকে শুধু দেখেই গেলাম।
এভাবে রোজ তাকে দেখাতাম লুকিয়ে। একদিন সে আমাকে জানালায় দেখে ফেলল৷ আমি চট করে চোখ ঘুরিয়ে নিলাম। সেও বিশেষ পাত্তা দিলো না মনে হলো ব্যাপারটাকে।

একদিন মাদরাসা থেকে ফিরছিলাম। সেদিন তাড়াতাড়িই ছুটি হয়ে গিয়েছিল আমাদের। মাঝপথে হঠাৎ সেই বালকের দেখা। সে তার বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে বাড়ির পথে যাচ্ছে। আমি পেছন থেকে মুগ্ধ নয়নে তাকে শুধু দেখেই গেলাম। সে খেয়ালও করলো না। তার পা বাড়ানো, তার কথা বলা, তার হাসি সবটা যেন আমাকে বিমোহিত করে তুলছিল। কেমন যেন ভালোলাগা কাজ করছিল মনের ভেতর।
এভাবেই কাটছিল দিন। রোজ লুকিয়ে তাকে দেখা, তার হাসি, তার ফোনে কথা বলা, উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকানো সবটাই কেমন যেন ছন্দময়। দিন যতই যাচ্ছে আমার তার সাথে কথা বলার ইচ্ছেও ততই বাড়ছে। আমি পারছিলাম না তার সাথে কথা না বলে থাকতে। কিন্তু আমি এমনও না যে , যেচে গিয়ে কোনো ছেলের সাথে কথা বলবো। আবার সেও তো কখনোই আমার সাথে কথা বলতে আসবেনা। সে তো আমাকে চেনেই না।
খুবই তৃষ্ণার্তভাবে দিন কাটছিল। প্রায়ই মন খারাপ করে থাকি। খেলায় মন বসেনা, পড়ায় মন বসেনা, গল্পের বইয়েও মন বসেনা। আমার এই অবস্থা দেখে আমি নিজেই অবাক।

এমনই মন খারাপের একটা দিনে আমি প্রাইভেট পড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে বের হচ্ছিলাম৷ এলোমেলো পা ফেলছি। হঠাৎ সামনে কারো জোড়া পা দেখে সাইড দিয়ে আসতে গেলাম। কিন্তু সে আমার পথ আটকে দাঁড়ালো। আমি এবার চমকে উপরে তাকালাম।

এ তো সেই বালক। (আমি তার নাম জেনে গেছি অনেকদিন আগেই।) আমি মুগ্ধ নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছি। এই তো সেই ঘোলাটে চোখ। যার গভীরে লুকিয়ে আছে অনেক না বলা কথা, অনেক কষ্ট। আমি হারিয়ে যাচ্ছি সেই চোখের মায়ায়। এ কোন জালে আটকা পড়লাম আমি। আমি তার দিকে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছি এমন সময় সে আমার চোখের সামনে তুড়ি বাজালো। আমি চমকে চোখ সরিয়ে নিলাম। সে বলল,

– তুমি কি এখানে প্রাইভেট পড়ো?
– জ্বি। আড়ষ্ট হয়ে উত্তর দিলাম আমি।
– ওহ। কোন ক্লাসে পড়ো?
– ক্লাস এইটে।

– ওহ গুড। আমি ক্লাস নাইনে। কোথায় পড়ো তুমি?

“চেয়ারে বসে টেবিলে পড়ি” কথাটা বলার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাকে তো সেই কথা বলা সম্ভব না তাই মাদরাসার নাম বললাম।
– তোমার বাবা তো ঐ মাদরাসার প্রফেসার তাই না?
– জ্বি সিনিয়র প্রফেসার।
– যাইহোক, উনি যদি তোমাকে এখন দেখে ফেলে কি হবে?
– কি হবে? পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি।

Related Post

– তুমি যে একটা ছেলের সাথে কথা বলছো। উনি তোমাকে এমনি এমনিই ছেড়ে দিবে?
– কথা তো আপনি বলছেন।
– তুমিও তো বারণ করছো না।

আমি চুপ করে গেলাম।
– তোমার বাবা কি জানেন যে উনার মেয়ে রোজ পড়তে এসে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে থাকে? সে বললো।
– ( ওহ মাই আল্লাহ! কি বলছে এসব?) কি বলছেন? কার দিকে তাকিয়ে থাকি আমি? অবাক হওয়ার ভান করে বললাম আমি।

– রোজ ঐ জানালা দিয়ে কে তাকিয়ে থাকে? জানালাটা দেখিয়ে বললো ছেলেটা।
– ওহ আমি তো প্রকৃতি দেখি। আমি মুচকি হেসে বললাম।
– তাই বুঝি?
– হুম।
– তাই? এবার ধমকে বলল সে।

– হহহ্যা তাই তো। তোতলাতে তোতলাতে বললাম আমি।
– তাহলে আমার চোখ ঘোলাটে, চুল উসখোখুসকো এসব জানলে কি করে?

যাহ্! এতো দেখি আমার মন পড়ে বসে আছে।মনে ঢুকতে দিয়েছি বলে এভাবে সব পড়ে ফেলতে হবে? মনে মনে বললাম আমি।

– কি হলো চুপ করে আছো কেনো?
– কিছু না। আমি এসব কিছু ভাবিনা, দেখিওনি। আমি আপনাকেও চিনিনা।
– আচ্ছা, এতদিন লুকিয়ে দেখে এখন চিনিনা? ছেলেটা বললো।
– আমি সত্যি আপনাকে চিনিনা। না চেনার ভান করে বললাম আমি।

– যাক তাহলে ভালোই হলো। আমি চলে যাচ্ছি অনেক দূরে। এটা কেন জানি তোমাকে জানাতে ইচ্ছে করলো তাই জানালাম। তুমি যখন আমাকে চেনোইনা তখন… আচ্ছা ভালো থেকো তাহলে। সে চলে যেতে লাগলো।

– আপনার নামটা কি? তার সমস্ত কথা শুনে ততক্ষণে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি। সে চলে যেতে নিলেই অনায়াসে আমার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে আসে।
– ই… চলেই তো যাচ্ছি। নাম জেনে কি হবে? ভালো থেকো। সে আর নাম বললো না। চলে যেতে লাগলো।

সে চলে যাচ্ছে। আমি তখনো বাকহীন ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে কিছু বলার সুযোগও দিলনা। আমি শুধু তার এলোমেলো পা ফেলে চলে যাওয়া দেখছি। আজও সে আকাশপানে চেয়ে আছে। হাত দিয়ে এলেমেলো চুলে বিলি কাটছে। আমিও উল্টো পথে হাঁটতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম,
কেন সে সুন্দর এলোমেলো চুলগুলোতে একাই হাত চালাবে, একাই বিলি কাটবে? আমাকে কি একবার সুযোগ দেয়া যেতোনা ওই চুলে হাত রাখার? কেন তার অত সুন্দর ঘোলাটে চোখ দুটো দুঃখের নোনা জলে ভরে থাকবে? সে কি পারতোনা সমস্ত কষ্টগুলো আমার সাথে ভাগ করে নিতে?

সে কি পারতো না আমাকে তার এলোমেলো পথের চলার সঙ্গী করে নিতে? মেঘলা বিকেলে একাকি না থেকে আমাকে তার পাশে রাখতে?

নাহ্ সেসব কিছুই হলোনা। শুরু হওয়ার আগেই সবটা শেষ হয়ে গেলো। কেন জানি আজ নিজেকে বড্ড একা একা লাগছে। বড্ড মিস করছি তাকে। তার নামের প্রথম অক্ষরটা তার মুখেই শুনলাম। আমার নামের মতোই। যদিও আমি তার নাম আগে থেকেই জানি। আর কখনো শোনা হবেনা তার নামটা?
আর কখনোই কি আমি তার দেখা পাবোনা?
কখনোই তার ঘোলাটে চোখে চোখ রাখা হবেনা?
কখনোই তার এলো চুলে বিলি কাটা হবেনা?
কখনোই তার পাশাপাশি হাত রেখে চলা হবেনা?

কেন জীবন এত নিষ্ঠুর? সব কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ করে দেয়? কেন এত কষ্ট দেয় সবাইকে?
কেন? কেন? কেন?

Recent Posts

  • নভেরা
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

দেশী পণ্যের প্রসার ও নিজের ‘ব্র‍্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চাই: তাসনিম লোপা

বাঁশখালী টাইমস, নভেরা ডেস্ক: 'অনলাইন ব্যবসায় লাখপতি' কথাটি কয়েকবছর আগেও আষাঢ়ে গল্পের মতো শুনাতো। কিন্তু…

17 hours ago
  • স্মরণ
  • শীর্ষসংবাদ

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নানের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বাঁশখালী টাইমস: আজ ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ বাঁশখালী থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার, চট্টগ্রাম মুক্তিযোদ্ধা…

1 day ago
  • সংগঠন সংবাদ
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবিতে বাঁশখালীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত

বাঁশখালী টাইমস: বাঁশখালীতে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন বাঁশখালী উপজেলা…

2 days ago
  • সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • জলকদর (সাহিত্য আয়োজন)
  • শীর্ষসংবাদ

শিশুকাম, প্রকৃতির প্রতিশোধ ও নৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

শিশুকাম, প্রকৃতির প্রতিশোধ ও নৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ✏️ দিলুয়ারা আক্তার ভাবনা 'তৌসিফ আঁতকে উঠল। সেই…

5 days ago
  • সংগঠন সংবাদ
  • শীর্ষসংবাদ
  • সারা বাঁশখালী

রত্নগর্ভা শামসুন্নাহার চৌধুরীর ইন্তেকাল, বাঁশখালী সমিতি চট্টগ্রামের শোক বিবৃতি

বাঁশখালী সমিতি চট্টগ্রামের অর্থ সম্পাদক লায়ন নাসিমুল আহসান চৌধুরী জুয়েল পিএমজেএফ'র মমতাময়ী মা রত্নগর্ভা শামসুন্নাহার…

6 days ago
  • শীর্ষসংবাদ
  • শোক সংবাদ

ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ইকবাল বাহার রনির ইন্তেকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টাইমস: বাঁশখালীর কৃতিসন্তান সাধনপুর ইউনিয়নের বৈলগাঁও নিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আবদুল মান্নানের…

1 week ago