জলকদর সমাচার || মুহাম্মদ মোখতার হোছাইন সিকদার

জলকদর সমাচার
মুহাম্মদ মোখতার হোছাইন সিকদার

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কাব্যে যে নামটি বাঁশখালীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম জলকদর, জলকদর খাল। শঙ্খ বা সাঙ্গুনদীর দক্ষিণকূলের ঈশ্বরবাবুর হাট এলাকা থেকে দক্ষিণে বাঁশখালীর বুকচিরে ধেয়ে চলা শেখেরখীল ফাঁড়ির মুখ দিয়ে হাটখালী নৌ-বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া খালটির নাম “জলকদর খাল”। যেটিকে আমরা দেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কাব্যেও খুঁজে পাই। তিনি চাক্তাই থেকে শঙ্খ-জলকদর হয়ে নৌপথে কুতুবদিয়া গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর কাব্যে জলকদরের কাব্যিক বর্ণনা এভাবে দিয়েছিলেন-

‘জলকদরের খাল পেরিয়ে জল পায়রার ঝাঁক
উড়তে থাকে লক্ষ্য রেখে শঙ্খ নদীর বাঁক।
মন হয়ে যায় পাখি তখন মন হয়ে যায় মেঘ
মন হয়ে যায় চিলের ডানা, মিষ্টি হাওয়ার বেগ।’

[আকাশ নিয়ে: আল মাহমুদ]

ঈশ্বরবাবুর হাট:

বঙ্গোপসাগর-সাঙ্গু নদীর মাছ ধরার বোট ও মাঝি-মল্লাদের মিলনায়তন বলে খ্যাত ছিল এক সময় এ ঈশ্বরবাবুর হাট। এই হাট থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা নৌপথে নৌযানে চড়ে চট্টগ্রাম শহরে যাওয়া-আসা করতেন।

সাঙ্গুনদীর দক্ষিণ কূলের ঈশ্বরবাবুর হাট এলাকা থেকে দক্ষিণে বাঁশখালীর বুকচিরে ধেয়ে চলা শেখেরখীল ফাঁড়ির মুখ দিয়ে হাটখালী নৌ-বন্দর হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া খালটির নাম আমরা সকলে জানি ‘জলকদর খাল’ বলে জানি।
ঈশ্বর বাবুর হাট থেকে দক্ষিণে কতদূর সামনে এগুলেই হিন্দু জমিদার রায় চৌধুরীর প্রবর্তিত চৌধুরীঘাট। এখন আর ঘাট নেই, হয়েছে ব্রীজ ও বাজার। এ বাজার ইতিহাসের অনেক ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী। এ চৌধুরীঘাট লঞ্চ/ইস্টিমার ঘাট হিসাবেই সমধিক পরিচিত ছিল কোনো এক সময়। যদিও পূর্ব ও পশ্চিম দুইপারের মানুষজনের পারাপারের বিকল্পহীন মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার হতো এই চৌধুরী ঘাট। বিশেষ করে বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত মওলানা আশরাফ আলী সাহেব হুজুর (রহ.) এর দর্শনলাভ প্রত্যাশীগণের এ ঘাট ব্যবহার ছিল অতিব প্রয়োজনীয়। এমনিভাবেই এই ঘাট বাঁশখালীসহ আশেপাশে পুর্ণ্যার্থীদের কাছে একটি বিখ্যাত ও পরিচিত ঘাট হয়ে উঠেছিল।

অপর সাধক হাফেজ নুর আহমদ হুজুর (রহ.) তথা ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন রায়ছড়া যাতানুরাইন ফাজিল মাদ্রাসাসহ অনেক দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তার সাক্ষাতেও পূর্বের লোকদের এ ঘাট ব্যবহার করতে হতো।
কোয়ার্টার মাইলেরও কম দূরত্বে দক্ষিণে এগুলেই প্রাচীনতম ‘করিম বাজার’। এ বাজার এখনও বহুকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ছড়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করাকালে এ বাজার দিয়ে গমনাগমন করত ছাপাছড়ির বিখ্যাত বড় মওলানা আব্বাস আলী (রহ.)। এ বাজারেই ভক্তদের সাক্ষাত দিতেন তিনি। মওলানা আব্বাস আলী আওয়াল সাহেব হুজুর হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল মাদ্রাসাঙ্গনে। ছাপাছড়ি গ্রামের সেকালের সর্বজন গ্রহণযোগ্য করিম মাস্টারের নামেই চালু হওয়া সেই বাজারটি এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে শীর্ণকায়। আর নতুন প্রজন্মকে এ বার্তা দিয়ে যাচ্ছে যে- এক সময় তোমাদের এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীকেন্দ্রীক। অর্থাৎ এ জলকদর খালই মানুষের যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন। জনশ্রুতি আছে, করিম বাজারের মাছ-তরকারি না হলে বউ-ঝিয়েদের ঢেঁকির ছাটাই চালের ভাতের সাথে স্বাদের রান্না করা তরকারি পরিবেশন করা যেত না।

এই বাজারের আর কিছু সামনে গিয়ে পশ্চিম পাশে বর্ষার পানি নির্গমনের বড় একটি স্লুইসগেট। এর মাধ্যমে ডোংরা ও তার নিকটবর্তী এলাকার পানি চলাচল করে।
মোশাররফ আলী হাট বাঁশখালীর বিখ্যাত ও নামকরা একটি বাজার। এখনো ঠাঁই দাড়িয়ে আছে বহুকালের সাক্ষী হয়ে। বাহারছরা ইউনিয়নের মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত এ বাজার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করছে, তার পশ্চিমে নিকট অতীতে প্রতিষ্ঠিত বাঁশখালী উপকুলীয় কলেজ। এই হাট যেমন মানুষের চাহিদা মেটাতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের যোগান দিয়ে যাচ্ছে, আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা উপকূলবাসীর শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে এ কলেজ ভূমিকা রেখে চলেছে। পাশাপাশি দারুল ইসলাহ মাদ্রাসা এই এলাকার ইসলামপ্রিয় মানুষের মাঝে হেদায়তের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। এই হাটের পাশে অবস্থিত ছাপাছড়ি হাই স্কুল মাধ্যমিক শিক্ষার চাহিদা পূরণে অতুলনীয় ভূমিকা রাখছে। এই মোশাররফ আলী হাট এখন শিক্ষার হাটের মত হলেও দূর-অতীতে গ্রামবাসীর নিত্য পণ্যের যোগানের সাথে জলকদর খালের নিয়মিত যাতায়াতকারী নাইয়্যা-মাঝিদের ও যাত্রী সাধারণের প্রয়োজন পূরণে বরাবরই এগিয়ে ছিল।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.