জলকদরের বুকচিরে কেন পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা?

BanshkhaliTimes

জলকদরের বুকচিরে কেন পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা

খোরশেদ চৌধুরী 

ইটভাটার জমি কি রহিমের না করিমের, ইটভাটা আবুলের না কাবুলের সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।
বিবেচ্য বিষয় হলো এই ইটভাটা আমাদের জন্য ও আমরা যে পরিবেশে আলো বাতাস গ্রহণ করে বড় হই সেই পরিবেশের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আসবে সেটাই।

পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ আমার সমমনা, স্ব-জাতি, স্ব-গোত্রীয়, স্বজনদের কেউ যদি নেয় আমি তার প্রতিবাদ করবো। অন্যায়ের প্রতিবাদ শত্রু মিত্র নির্বিশেষ সবার জন্য।
সে আমার মিত্র তাই তার করা অন্যায়কে ন্যায় বানানোর অপচেষ্টা করবো, আর সে আমার শত্রু তাই তার ন্যায়কে অন্যায় বানানোর অপচেষ্টা করবো। এটা অন্ততপক্ষে বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের কাজ নয়।

এবার আসি মূল পয়েন্টে। আমরা গত কয়েক বছর ধরে জলকদর খালের করুণ দশা দেখে দেখে মর্মাহত হয়েছি। শ্রদ্ধেয় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে জলকদর বাঁচানোর জন্য আন্দোলন গড়ে উঠেছে।এমনিতেই জলকদরের অভ্যন্তরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা, মাছের ঘেরসহ অবৈধ দখলদারীত্ব পরিবেশ-সচেতন শিক্ষিত যুবকদের ভবিষ্যৎ জলকদর নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছিড়ে চ্যাপটা হতে চলেছে এককালের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম স্রোতস্বিনী জলকদর। যেন নিঃশ্বাস ফেলতে পারাটা বড় দায়। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের প্রিয় জলকদর নালায় পরিণত হবে আগামী এক দশকের মধ্যে।

গত দুই দশক পূর্বেও যার বুকে ছিল শত পালতোলা নৌকার ঝাঁক। সাঙ্গু থেকে খাটখালী পর্যন্ত অবাধ বিচরণ ছিলো নৌকা, লঞ্চ, স্টিমারের। অথচ আগামীর প্রজন্ম জলকদর কি ছিল সেটা ভুলতে বসবে। ঠিক এসময়ে এসে জলকদরের তীরে ইটভাটা করা মানে মরার উপর কাঁটার ঘা। সরেজমিনে দুই একবার দেখে এসে মনটাকে কোনোভাবে মানাতে পারছি না। এতো মানুষের অনুরোধ, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পরও ইটভাটা সংশ্লিষ্টদের হটকারিতা অবাক করেছে। তাই বিবেকের দায় থেকে না লিখে পারলাম না।

এই ইটভাটার দ্বারা কী ক্ষতি হতে পারে?
ইটভাটার কালো ধোয়া (কার্বন মনোঅক্সাইড,কার্বনডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড) বাতাসে মিশে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। জটিল রোগব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যেমন, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, কাশি ইত্যাদি।
আশেপাশের বাড়ির টিনসহ ধাতব পদার্থে মরিচা ধরবে
জমির উঁচুস্থরের উর্বর অংশ ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাবে। শস্য উৎপাদনের হার কমে যাবে।
ধুলাবালি নাকে মুখে প্রবেশ করবে। শ্বাসকষ্ট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।
জলকদর ভরাটের কবলে পড়ে নাব্যতা হারাবে। গাছে ফলমূলের উৎপাদন কমে যাবে। যেমন ডাব, পেপে,আম, পেয়ারা ইত্যাদি। ইটভাটার মাধ্যমে বাহুবল বৃদ্ধি, যার মাধ্যমে সামাজিক কোন্দলকে দীর্ঘস্থায়ী করা হবে। রাস্তাঘাটের ক্ষতি হবে। গাছপালা কেটে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হবে। বনজ সম্পদের পরিমাণ কমে যাবে। এছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনেক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো ইটভাটার মাধ্যমে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান করা হবে। আচ্ছা এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান এটা একটা ভালো চিন্তা। কিন্তু কর্মসংস্থানের জন্য কি ভালো বিকল্প নেই? যার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি হবে না, জলকদরের ক্ষতি হবে না এমন কিছু কি নেই?
আমার কাছে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ইটভাটা বিষয়টি হাস্যকর ও অবান্তর মনে হয়েছে। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য পরিবেশবান্ধব উত্তম বিকল্প রয়েছে। ইটভাটা কর্তৃপক্ষ সত্যিকারের এলাকাপ্রেমী হলে পরিবেশ বিধ্বংসী এ সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে উত্তম বিকল্প গ্রহণ করতে পারে। এতে ব্যবসাও হবে, কর্মসংস্থানও হবে।

ইটভাটা কর্তৃপক্ষের আরো দাবি এখানে অমুকের জমি নেই তমুকের জমি নেই। আচ্ছা মনে করেন এটাকে মেনে নিলাম। মেনে নিলাম জমির মালিক আপনি।
তারপরও তো পরিবেশের ক্ষতি করে, জলকদরের শ্বাসরোধ করে এ ইটভাটা করা যুক্তিসংগত নয়। জমি কার, ইটভাটা কার এসব মূল পয়েন্ট না। মূল পয়েন্ট হলো আমাদের রক্তনালী জলকদর ও আমাদের পরিবেশ।

ইটভাটা কর্তৃপক্ষ ও তাদের কিছু অপরিণামদর্শী সমর্থক দাবি করে প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই ইটভাটার কাজ চলছে। আচ্ছা এক মিনিটের জন্য মেনে নিলাম আপনারা ইটভাটা করার জন্য সবধরনের অনুমতি নিশ্চিত করেছেন। যদিও আমার জানামতে তা আপনারা করতে সক্ষম হননি।
ধরে নিলাম টাকাপয়সা – ক্ষমতার ব্যবহার করে আপনারা টপ টু বটম সব সেট করে ইটভাটা করার সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছেন। সব অনুমতি নিয়েছেন, নিজের বিবেকের অনুমতি নিয়েছেন কি? নিজের বিবেক হচ্ছে সবচেয়ে বড় আদালত। নিজে নিজে বিচার করেন আপনাদের কাজটা কতটুকু যুক্তিসংগত।

দুঃখজনকভাবে গত ঈদুল আযহার দিনে সামাজিক কোন্দলে অন্যায়ভাবে হাফেজ এরফানকে হত্যা করা হয়। যার কারণে সমগ্র এলাকাবাসী এটার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। এলাকাবাসীর সহানুভূতি পেয়েছে হাফেজ এরফানের পরিবার। এই সহানুভূতির ফলাফল তো সমগ্র রত্নপুর, বাগমারা, হালিয়াপাড়াবাসীকে কষ্ট দেওয়া। আপনারা যেখানে সবাইকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার কথা তারা কেনো আজকে এলাকাবাসীকে(রত্নপুর) শত্রু বানাচ্ছেন?

রত্নপুরের পরিবেশ সচেতন কিছু সামাজিক সংগঠন ইটভাটার বিরুদ্ধে যৌক্তিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। ইটভাটা কর্তৃপক্ষের কারো কারো দাবি আন্দোলনের মাধ্যমে কেউ কেউ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। এটাকে অস্বীকার করছি তা নয়। কয়েকজন স্বার্থান্বেষীর কারণে সচেতন ও শিক্ষিত যুবকদের ইটভাটা বিরোধী যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই।

বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়ার জন্য শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, বিবেক থাকাই যথেষ্ট। কারণ অনেক শিক্ষিতরা তাদের বিবেককে বন্ধক রেখেছে। তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ ব্যক্তি, দল, মত নির্বিশেষে পরিবর্তনশীল।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.