জলকদরের অবয়চিত্রঃ যেখানে যেমন জলকদর (২১-৩২)

জলকদরের অবয়চিত্রঃ যেখানে যেমন জলকদর (২১-৩২)
মুহাম্মদ মোখতার হোছাইন সিকদার

 মলকা বানুর দীঘি ও ডোমঘোনা স্লুইচ গেইট (২১):

বাঁশখালীর অন্যতম সুফী সাধক সর্বজন শ্রদ্ধেয় সিকান্দর শাহ (রহ.) এর বাড়ির পূর্ব পাশে ঐতিহাসিক মলকা বানুর দীঘির সামান্য পূর্ব-দক্ষিণ জলকদরের পাড়ে আরও একটা স্লুইচ গেইট আছে। মলকাবানুর দীঘি সেকালে গীতিকার ও সুরকারদের গদ্য-পদ্য ও কবিতা পাঠের সূতিকাগার ছিল। মলকাবানুর দীঘি নিয়ে বহু রম্য কাহিনির প্রচার আছে । জারি-সারি ও কাওয়ালী গানের আসরও বসত এই মলকাবানুতে। সত্তরোর্ধ বয়সী মানুষেরা এই মলকাবানুর কথা বলতেই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে দেয় সেই পুরানো দিনের কথা মনে করে। কেউ কেউ বলে সেখানে নাকি রাতের আঁধারে পরী নাচতো! এই মলকাবানুর দীঘির উত্তর-পশ্চিম কর্ণারে শতবছরের পুরানো একটা মসজিদও আছে। এই দীঘি এই মসজিদ মলকাবানুর নামে কোনও এক মহীয়সী নারী মানবতার কল্যাণে নিজ জমিদারিত্বের আওতায় প্রতিষ্ঠা করছিলেন।

 হৈরা ঘোনা স্লুইচ গেইট (২২)
জলকদরের পূর্ব পাড়ের পশ্চিম মিনজিরিতলা হৈরাঘোনার পানি নিষ্কাসনে এই স্লুইচ গেইট ব্যবহার হত। বর্ষার মৌসুমে এখানে লোকজন গুইল্লা (কাটা) মাছ সংগ্রহ করতেন সেকালের তরুণেরা। এখনো সেই চিত্র কদাচিৎ দেখা যায়।

 সরল আমিরিয়া হাই স্কুল (২৩)
জলকদরের কল্যাণে সরল আমিরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় একটি প্রস্ফুটিত বিদ্যা নিকেতনে পরিণত হয়। উপকূলবর্তী পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আমিরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় জ্ঞানের আলো বিতরণ করে এলাকাবাসীকে শিক্ষা সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই এলাকার কৃতি সন্তান সরকারের সচিব হাবিবুল কবির দুলু এই স্কুল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

 সরল বাজার ব্রীজ ও ঘাট (২৪)
আসলে মলকাবানুর দীঘির অল্প একটু উত্তরে সরল বাজার। এই বাজারেই ছিল পারাপারের ঘাট। এখন আর ঘাট নেই, হয়েছে ব্রীজ। এই ব্রীজই এখন সরলের মানুষের পূর্বে যাতায়াতের মূল পথ হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

 কান্দাখালী খাল ও স্লুইচ গেইট (২৫)
জলকদরের সাথে সংযুক্ত খালসমূহের মধ্যে কান্দাখালী খাল অন্যতম একটি খাল। এই কান্দাখালী খাল সেই অইট্টালতলের পশ্চিমে অবস্থিত মুন্সি হাট পর্যন্ত বিস্তৃত। মুুন্সিহাট বহু ঘটনার সাক্ষী। এখানে সময় অসময় নাইয়্যা-মাঝিরা তাদের প্রয়োজনীয় সদাই করতেন।

 মুুন্সিহাট (২৬)
এই মুন্সিহাট কান্দাখালী খালের শেষ মাথায় অবস্থিত। এই হাট থেকে সেকালে নাইয়্যা-মাঝিরা তাদের সামুদ্রিক ভ্রমণে সওদা করতেন। বাঁশখালীতে প্রচীনতম হাটগুলোর মধ্যে মুন্সিহাট সমধিক পরিচিত ছিল। তবে কিছু সময় এই হাট হারিয়ে যেতে বসছিল। কিন্তু এখন আবারও নব যৌবন ফিরে পেতে শুরু করেছে।

 বরইতলী কুম ও বাজার (২৭)
বরইতলী কুম জলকদরের একটি রহস্যে ঘেরা কুম। জনশ্রুতি মোতাবেক এই কুমে কত মানুষ যে ঢালি খাইছে কার কোনও হিসাব নেই। এই কুমে কত গরু মহিষ ও ছাগল ঢালি নেয় সে কথা আজ যারা ষাটোর্ধ বয়স তারা ভালো বলতে পারবেন। আর আজকের বিজ্ঞানের যুগে এই জাতীয় কথাকে অনেকে বলবেন এইগুলো এমনিতে বেহিসাবী কথা। কিন্তু এটা সত্যি যে, এই কুম অতিক্রম করার সময় নাইয়্যা মাঝিরা অনেক বেশী সাবধানে তাদের জলযানসমূহ চালিয়ে যেতেন। আর দোয়া দরুদ যে কত পড়তেন তার তো কোনো ইয়ত্তা নেই।

 হালিয়া পাড়া মাদ্রাসা (২৮)
হালিয়া পাড়ায় একটি হেফজখানা ছিল। এই মাদ্রাসায় প্রায় সময় আল্লামা শাহ ছুফি সিকান্দর শাহ (রহ.) আসা যাওয়া করতেন। সেখানে বসে তিনি ভক্তদের সাক্ষাৎ দিতেন। সেই সুবাদে মাদরাসাটি সচল ছিল।

 চুনতি বাজার ব্রীজ ও স্লুইচ গেইট
চুনতি বাজার এক সময় সাধারণের মাঝে অতি পরিচিত এক বাজার ছিল। কাথারিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমে অবস্থিত এই বাজারের তরী-তরকারী ছিল সহজললভ্য। বিশেষ করে পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর তটে যে সবজি ও ফলমূলের ব্যাপক চাষ হতো। তার বেচাবিক্রি হতো এই বাজারে। আর সাগর পথেও এই বাজারের শাকসবজি চট্টগাম শহরে নিয়ে যাওয়া হতো।

 রত্নপুর হাইস্কুল (২৯)
রত্নপুর হাই স্কুলটা মূলত এই জলকদরের তীরে প্রতিষ্ঠত একটি বিদ্যাপীঠ। কিছুকাল আগেও এটি জুনিয়র স্কুুল ছিল। এখন এটা এমপিওভূক্ত হাইস্কুলে রুপান্তরিত হয়েছে। জলকদরের উদারতা অভাবনীয়, কারণ জলকদর আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলতে একটি স্কুলকেও বুকে ধারণ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া শিখে অনেকে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখছেন বর্তমানে।

 বাহারচরা সুলতানিয়া মাদ্রাসা (৩০)
বাহারচরা মাদ্রাসা নামে পরিচিত এই দ্বীনী প্রতিষ্ঠানটি। এই মাদ্রাসাটি এখনো বহাল তবিয়তে দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই মাদারাসাটি এক সময় সরকারি (সিলেবাসে) মাদ্রাসা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে মাদারাসাটি কওমী ধারায় রুপান্তরিত হয়। এলাকাবাসী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বাঁশখালীতে যে সব প্রতিষ্ঠান প্রাচীন তার মধ্যে বাহারচরা সুলতানিয়া মাদরাসাও একটি। প্রতিষ্ঠানটি এখনো দ্বীন প্রচারে নিরলস ভূমিকা রেখে চলেছে।

 বশিরুল্লাহ মিয়াজী বাজার ব্রীজ ও ঘাট (৩১)
পশ্চিম বাঁশখালীতে এককালে ডাবের হাট নামে খ্যাত ছিল এ বাজার। এখনো এই বাজারে বছরের প্রায় সময় ডাব পাওয়া যায়। আগে মানুষ পারাপারের জন্য এখানে একটা ঘাট ছিল। পরে এখানে এই ঘাটের স্থলে একটি ব্রীজ নির্মিত হয়। যা বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। অথচ এই টানা ব্রীজটির সংস্কার অতীব জরুরী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দএ বিষয়ে উদ্যোগ নিলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। এক সময় এ বাজার পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত থাকলেও বর্তমানে এ বাজারটি উভয় পাড়ে সম্প্রসারিত হয়েছে।

 খাইরুল বশরের বাড়িস্থ স্লুইচ গেইট (৩২)
বিশিষ্ট সমাজ কর্মী জনাব খাইরুর বাশার সাহেবের বাড়ি অনতিদূরে একটা স্লুইচ গেইট আছে। ঠিক তার বিপরীত দিকে আরও একটি স্লুইচ গেইট আছে। যা দিয়ে এলাকার বর্ষার পানি নিষ্কাসন করে গ্রামবাসীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখতে কাজ করে যাচ্ছে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.