করোনা পরিস্থিতি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিয়ে ট্রাম্পের রাজনীতি

Banshkhali-Mohila-Madrasha

দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশী পথচলার পর গত ২৯ মে এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন।
হু এর প্রতি এত ক্ষোভ কেন ট্রাম্পের? নিজের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, আগামী নির্বাচনে জয়লাভ এবং ব্যবসায়িক লাভক্ষতির অংকের সাথে জড়িত আছে কি? চলুন কিছুটা গভীরে দৃষ্টি দেওয়া যাক।

IMG-20200626-043035

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষোভের কারণ মূলত চারটি।
১। নোবেল করোনা ভাইরাস চীনের গবেষণাগারেই তৈরি হয়েছে হু এর পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো ঘোষণা না দেওয়া:
এই ব্যাপারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে আগ্রহী ও উৎসুক মানুষ দ্বিতীয়টি নেই। ট্রাম্পসহ বিশ্বের অনেক মানুষ এবং কিছু বিজ্ঞানী দাবি করছেন জৈব মারণাস্ত্র হিসেবে চীনের ল্যাবে বানানো হয়েছে এই বিশেষ করোনা ভাইরাস। কিন্তু প্রথিতযশা অনেক বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা বলছেন এত ক্ষুদ্র ভাইরাস বানানোর মত সক্ষমতা মানবজাতির এখনো হয়নি। সেই সাথে মার্কিন তদন্ত দলেরও কোনো তৎপরতা নেই এটি উদঘাটনে। স্পষ্ট প্রমাণাদির অভাবে শুধুমাত্র অনুমান নির্ভর হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনকে এক্ষেত্রে দায়ী করতে পারেনা।

২। নোবেল করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় চাইনিজ নীতিকে হু এর পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া:
করোনা ভাইরাস চিকিৎসায় স্পষ্টত কোনো ঔষুধ না থাকায় চীনের গৃহীত লকডাউন নীতিকে স্বীকৃতি দেয় হু। যার ফলে মার্কিন অর্থনীতিসহ বিশ্বের সামষ্টিক অর্থনীতির বারোটা বেজে গিয়েছে। যেটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের মোটেও পছন্দ হয়নি। তার উৎসাহে আমেরিকাতে লকডাউন বিরোধী মিছিলও বের হয়েছে।

৩। ট্রাম্পের মতে চীনের সাথে হু এর লেজুড়বৃত্তিক সম্পর্ক:
প্রকৃতপক্ষে চীন যে ডাটা দিয়েছে হু তার ভিত্তিতে তড়িৎ পদক্ষেপ নিচ্ছিলো। চীন প্রচুর তথ্য গোপন করে এটা বিশ্বে প্রচলিত সত্য। চাইনিজ সরকারের ৩১ শে ডিসেম্বরের রিপোর্টের ভিত্তিতে হু ৫ জানুয়ারী উহান শহরে নিউমোনিয়ার মত কিছু একটা ঘটছে বলে টুইট করে। সংস্থাটির কাছে যথেষ্ট তথ্য না থাকায় চীন যখনই কিছু সরবরাহ করে তখনই যাচাই করে নিজেদের টুইটার পেজে তা প্রচারের ব্যবস্থা করে হু। পরবর্তীতে চীনের বাইরে করোনার প্রকোপ দেখা দিলে হু নিজেদের মত করে গবেষণার সুযোগ পায়।জানুয়ারির ২৫ তারিখ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় চীনের প্রেসিডেন্টকে আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে চীনের আন্তরিক পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদও জানান!

৪। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে করোনা চিকিৎসায় বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া:
ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে হু এর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ঔষুধ নিয়ে। ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিকারের এই ঔষুধের মালিক ফ্রান্সের জায়ান্ট কোম্পানি সানোফির শেয়ার আছে ট্রাম্পের। যদিও অতি ক্ষুদ্র শেয়ারের কারণে এই ঔষুধ বেশী বিক্রয়ে ট্রাম্পের একাউন্ট তেমন একটা ভারী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ব্যক্তি ট্রাম্পের সাইকোলোজি এমন যে তিনি নিজের কথা সবার মাঝে চাপিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)তে যুক্তরাষ্ট্র বাৎসরিক ৪০০ মিলিয়ন ডলারের উপর অনুদান দেয় কিন্তু চীন দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলারের মত। বারংবার এই কথা বলে ট্রাম্প কি এটাই বুঝাতে চাচ্ছেন যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশী সাহায্য করছে সেহেতু মার্কিন সরকার যা বলে সংস্থাটিকে সেটাই মেনে নিতে হবে! অথচ এই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ঔষুধ খোদ মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা চিকিৎসায় ব্যবহারে নিষেধ করে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে। আবার ট্রাম্প গত ১৯ মে জানিয়েছেন গত দু সপ্তাহ ধরে তিনি এই ঔষুধ খাচ্ছেন এবং সুস্থ আছেন। নিজ দেশ এবং হু এর নিষেধ সত্যেও এই ধরনের কথা তার একগুঁয়েমির বহিঃপ্রকাশ, সেই সাথে তার সমর্থকদের জন্য বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকির বার্তা দেয়।

মোদ্দাকথা করোনার কারনে বেসামাল অর্থনীতি, অর্থনৈতিক মন্দার কারনে নব্য সৃষ্ট ৪ কোটি বেকার, নিজ দেশের অভ্যন্তরে বর্ণ বৈষম্য সহ নানাবিধ সামাজিক চাপ, অন্যায়, বিদ্রোহে টালমাটাল অবস্থায় ট্রাম্পের দরকার ছিল নতুন কোনো ছুঁতা যেটা দিয়ে তিনি টপকে যেতে পারবেন আসন্ন নির্বাচনী বৈতরণী। যার কারনে হু, চায়নাকে ক্রমাগত দোষারোপ করে জাতীয়তাবোধ জাগরণের মাধ্যমে নিজের ভোটের পাল্লা ভারী করার মিশনে নেমেছেন তিনি।

অন্যদিকে করোনা চিকিৎসায় আশার আলো দেখানো রেমডেসিভির এবং প্লাজমা থেরাপিকে অনুমোদন না দেওয়াতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(হু)কে অনেকেই বিষোদগার করছেন। গত ২৮ মে প্রকাশিত সর্বশেষ গাইডলাইনে হু বলেছে যথেষ্ট ক্লিনিক্যাল ট্র‍্যায়ালের অভাবে এখনই এসবের অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছেনা। হু এর মতে করোনা আক্রান্ত ৯৫% মানুষ নিজ থেকেই সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। ফলে রেমডেসিভির এর মত মারাত্মক প্বার্শপ্রতিক্রিয়া যুক্ত ঔষুধ সেবনে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা আছে। একই কথা প্লাজমা থেরাপির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্লাজমা থেরাপি দিতে হয় সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে কারণ এটি একটি জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। হু এসবের অনুমোদন দিলে ঢালাওভাবে করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার করার প্রবণতা শুরু হবে যার ফলে জটিলতা এবং মৃত্যুহার আরো বাড়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। যদি করোনা রোগীর অবস্থার অবনতি হয় তাহলে সম্ভাব্য যেকোনো কিছুই প্রয়োগ করা যেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য সার্স,মার্স উপদ্রবের সময়েও রেমডেসিভির নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছিল। তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ কাজ না করাতে এবং প্বার্শপ্রতিক্রিয়াজনিত কারনে এই ঔষুধ ব্যবহারে নিরোৎসাহিত করা হয় তৎকালীন বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে এবং এফডিএর অনুমোদনও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্লাজমা থেরাপিতে রোগী মৃত্যুর পর ভারত সরকার কিছুদিন আগে এ ব্যাপারে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণের কথা বলেছিল। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যার কাছ থেকে প্লাজমা নেওয়া হচ্ছে তার নমুনা যথেষ্ট পরীক্ষা করা হচ্ছেনা বলে অভিযোগ উঠছে, ফলে প্লাজমা থেরাপি হয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী। করোনা প্রকোপে যথেচ্ছ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের উপরেও সতর্কতা দিয়েছে হু। এভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হতে থাকলে ভবিষ্যতে এন্টিবায়োটিক রেসিস্টেন্ট হয়ে আরো ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে বিশ্ব এমন আশঙ্কা এবং পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের অধীনে বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন,সংক্রমন রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণার জন্য গঠিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

লেখক: মাহবুব ছোবহান চৌধুরী
ইঞ্জিনিয়ার, কলামিস্ট

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কোভিড-১৯

ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন। - জনস্বার্থে বাঁশখালী টাইমস