ঐতিহাসিক তবুক অভিযান || জামশেদুল আলম চৌধুরী

ঐতিহাসিক তবুক অভিযান
–––––––––––––––
মহান আল্লাহর দ্বীন ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে নবী (সা.)-কে বেশ কিছু ছোট-বড় যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু এসব যুদ্ধ প্রচলিত যুদ্ধ-সংঘর্ষ থেকে আলাদা। কারণ মুহাম্মদ স.-এর যুদ্ধগুলো প্রচলিত সামরিক অভিযান ছিল না, সাম্রাজ্য বিস্তার বা ধন-সম্পদ উপার্জনও লক্ষ্য ছিল না। বেশির ভাগ যুদ্ধই ছিল মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল প্রতিরোধমূলক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুহাম্মদ স. তাঁর বাহিনীকে আগে আক্রমণ করতে নিষেধ করতেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, মুহাম্মদ স. তাঁর জীবদ্দশায় ২৭টি বড় ধরনের যুদ্ধ (গাজওয়া), ৬০টি ছোটখাটো দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ (সারিয়া) সরাসরি পরিচালনা করেছেন (ইসলামী বিশ্বকোষ)। মুফতি শফি (রহ.) লিখেছেন, বড় যুদ্ধ গাজওয়া ২৩টি এবং ছোটখাটো যুদ্ধ (সারিয়া) ৪৩টি। (মুফতি শাফি: সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা ৮৫)

এসব যুদ্ধে মুসলিম-অমুসলিম মিলে নিহতের সংখ্যা এক হাজার আঠার। এত ছোট-বড় যুদ্ধে নিহতের এই সংখ্যা সমকালের ইতিহাসেও নগণ্য। এর বিপরীত দিকটিও দেখতে হবে, আর তা হলো, এসব নিহতের বিনিময়ে বেঁচে গেছে লাখো মানুষ। বর্বর আরবরা সভ্য হয়েছিল এসব যুদ্ধের বিনিময়ে। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল সমাজে। ইসলামের আগমনে নারীরা বেঁচে গিয়েছিল নিষ্ঠুর পুরুষতন্ত্র থেকে। একজন শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটেছিল দৈনিক দুই হাজার ৭৪০ বর্গমাইল। (গুলজার আহমদ : The battle of Prophet of Allah, Karachi, 1975, P. 28)

মুহাম্মদ স. যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর হাতে একজন অমুসলিমও নিহত হয়নি। তরবারি ব্যবহারের চেয়ে ক্ষমাই তাঁর যুদ্ধনীতির মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যারা যুদ্ধে নেই, শিশু, বৃদ্ধ, নারী, তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যেন কোনো অস্ত্র না ধরে, সে সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ প্রতিনিয়তই ছিল। সম্পদ, তা শত্রুদেরই হোক না কেন, নষ্ট না করতে তাঁর আদেশ সব সময়ই কাজ করত। মৃত শত্রুদের বিকলাঙ্গ করা তাঁর নীতিবিরুদ্ধ কাজ ছিল। এর পাশাপাশি কাফেররা মুসলিমদের বুক চিরে কলিজা পর্যন্ত চিবিয়ে খেয়েছে। যুদ্ধবন্দিদের প্রতি সব সময়ই মানবিক ব্যবহার তাঁর সমরনীতির অত্যাবশ্যকীয় অংশ ছিল। শত্রুপক্ষের কাছ থেকে সন্ধি বা শান্তির প্রস্তাব পেলে যুদ্ধ থেকে একেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। শান্তিচুক্তি কখনো ভঙ্গ করেননি।

নবী স. এর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল ‘তবুক যুদ্ধ‘। এটি হিজরী নবম সালের রজব মাসের এক রক্তপাতহীন ঐতিহাসিক ঘটনা। মূলত: ‘তবুক’-এ কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, শত্রুবাহিনী যাত্রা পথ থেকেই প্রস্থান করেছিল। হিজরী নবম সালের ২৮ রজব মাসে রসূলুল্লাহ স. ‘তবুক’ যুদ্ধে যাত্রা করেন বলে অনেক ঐতিহাসিকগণ একমত। তবে কেউ কেউ বলেন যে, হিজরী ১০/৬৩১ সালের নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাসে ‘তবুক যুদ্ধ’ সংক্রান্ত ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছিল।

এই যুদ্ধের জন্য রোমান শাসক কত আগ্রহী ও উৎসাহী ছিল তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয় যে, রোমান শাসক হিরাক্লিয়াস তার সৈন্যদের অগ্রিম এক বছরের খরচের অর্থ সামগ্রী বিতরণ করে দিয়েছিল। রোমান বাহিনী মোকাবিলা করার সাহস করেনি। তারা অধিক অগ্রসর না হয়ে ফিরে যায়। ‘তবুক’ মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যে অবস্থিত একটি স্থানের নাম। কেউ কেউ বলেন, এটি একটি দুর্গের নাম। কারো কারো মতে, এটি একটি ঝর্ণার নাম। ‘তবুক’ একটি ভূখন্ডের নাম বলেও অপর একটি মত রয়েছে।

মুতা যুদ্ধের পর রোমান খ্রিস্টানরা আরবদের উপর আক্রমণের সংকল্প গ্রহণ করেছিল। সে সময় সিরিয়া ছিল রোমানদের অধীনে। সিরিয়ার অধিবাসী গাস্সানী গোত্র খ্রিস্টান ধর্মালম্বী ছিল। এ জন্য রোমান শাসক মুসলমানদের উপর আক্রমণের জন্য এই গাস্সানী গোত্রকে নিয়োজিত করে। মদিনায় এ খবর পৌঁছার পর রসূলুল্লাহ স. সাহাবায়ে কেরামকে জানালেন।

যুদ্ধের কারণ:

এ যুদ্ধের প্রস্তুতির পেছনে প্রধান কারণ সক্রিয় ছিল ‘গুজব’। ‘বালকা’ নামক স্থানের মুসলিম বিদ্বেষী খ্রিস্টানরা রোমান শাসক হিরাক্লিয়াসকে এই মিথ্যা খবর দিয়েছিল যে, মদীনায় রসূলুল্লাহ স.-এর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। (তাছাড়া বর্তমানে ওখানে গরমের তীব্রতা আর দুর্ভিক্ষ চলছে।) এখনই তা সহজে অধিকার করা যাবে। আগ্রাসী হিরাক্লিয়াস এ মিথ্যা গুজবের সত্যতা যাচাই না করে মদিনা অধিকারের দুঃস্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে। সে এক রোমান সর্দারের নেতৃত্বে ৪০ (চল্লিাশ) হাজার সৈন্য প্রেরণ করে। অপর দিকে রসূলুল্লাহ স. এর নিকট খবর আসে যে, সিরিয়ায় রোমের বিপুল সংখ্যক সৈন্যের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে লখম, জুযাম, আমেলা এবং গাস্সানী গোত্রের বিপুল লোক। এটি গুজব ছিল না, ছিল সত্য ঘটনা। রসূলুল্লাহ স. এ বাস্তব ঘটনার খবর পেয়ে তবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং ৩০ (ত্রিশ) হাজার নিবেদিত প্রাণ মুসলিমকে নিয়ে এ বিপুল সৈন্য বাহিনীর মোকাবিলার জন্য যাত্রা করেন।

মুনাফিকদের ওজর:

রাসুল স. যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। এমন সময় তিনি (মুনাফিক) যাদ ইবনে কায়েস কে বলিলেন, হে যাদ, তোমার কি বনুল আসফার এর (রোমীয়দের) সাথে যুদ্ধে যাবার ইচ্ছা আছে? সে বলল, আমাকে এখানেই থাকতে অনুমতি দিন। আমাকে ফেৎনায় ফেলবেন না। কারণ আমার কওমের লোকেরা জানে যে, আমার ন্যায় মেয়েদের প্রতি দুর্বল আর কেউ নাই। অতএব আমার ভয় হয় যে, বনুল আসফারের মেয়েদের দেখে আমি ফেৎনায় পড়ে যাব। তার ব্যাপারে আয়াত নাযিল হল:
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ ائْذَن لِّي وَلَا تَفْتِنِّي ۚ أَلَا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُوا
অর্থ: তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও আছে, যে বলে, আমাকে (যুদ্ধে গমন) না করার অনুমতি দিন, আমাকে ফেৎনায় ফেলবেন না, শুনে রাখ তারাতো ফেৎনায় পড়েই গেছে। (সূরা তওবাহঃ ৪৯)

এক মুনাফিক বলল– لَا تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ ّ ‘তোমরা এই ভীষণ গরমের মধ্যে বের হয়ো না।‘ (সুরা তওবাহঃ ৮১) উহার জবাবে আল্লাহ তায়া’লা আয়াত নাযিল করলেন —

قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا ۚ لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ

অর্থঃ আপনি বলে দিন দোযখের আগুন (এর চেয়ে) অধিক গরম। যদি তারা অনুধাবন করত! (সূরা তওবাহঃ ৮১)

জিহাদ ফান্ডে দানের প্রতিযোগিতা:

(১) আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ) তাঁর সর্বস্ব এনে হাযির করলেন। আল্লাহ ও রাসূল ব্যতীত তার পরিবারের জন্য কিছুই ছেড়ে আসেননি। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জিহাদ ফান্ডে দানের সূচনা করেন।

(২) ওমর ফারূক (রাঃ) তাঁর সমস্ত মাল-সম্পদের অর্ধেক নিয়ে এলেন।

(৩) উসমান রা. পরপর পাঁচবারে হাওদাসহ ৯০০ উট, গদি ও পালান সহ ১০০ ঘোড়া, প্রায় সাড়ে ৫ কেজি ওযনের কাছাকাছি ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা, প্রায় ২৯ কেজি ওযনের কাছাকাছি ২০০ উক্বিয়া রৌপ্য মুদ্রা দান করেন। স্বর্ণমুদ্রাগুলি যখন রাসূলের কোলের উপরে তিনি ঢেলে দেন, তখন রাসূল স. সেগুলি উল্টে-পাল্টে বলতে থাকেন, مَا ضَرَّ عُثْمَانَ مَا فَعَلَ بَعْدَ الْيَوْمِ ‘আজকের দিনের পর কোন আমলই উসমানের কোন ক্ষতি করবে না’। এই বিপুল দানের জন্য তিনি مجهز جيش العسرة অর্থাৎ ‘তাবুক যুদ্ধের রসদ যোগানদাতা’ খেতাব প্রাপ্ত হন (ইবনু খালদূন)।

(৪) আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) ২০০ উক্বিয়া রৌপ্যমুদ্রা দান করেন।

(৫) আববাস ইবনু আব্দুল মুত্ত্বালিব বহু মাল-সামান নিয়ে আসেন।

(৬) আছেম বিন আদী ৯০ অসাক্ব অর্থাৎ প্রায় ১৩,৫০০ কেজি খেজুর জমা দেন। এতদ্ব্যতীত ত্বালহা, সা‘দ বিন ওবাদাহ, মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ প্রমুখ প্রচুর মাল-সম্পদ দান করেন। এভাবে এক মুদ, দুই মুদ করে কম-বেশী দানের স্রোত চলতে থাকে।

মহিলাগণ তাদের গলার হার, হাতের চুড়ি, পায়ের অলংকার, কানের রিং, আংটি ইত্যাদি যার যা অলংকার ছিল, রাসূল স.-এর নিকটে পাঠিয়ে দেন। কেউ সামান্যতম কৃপণতা করেননি।

এই সময় আবু আকবীল আনছারী (রাঃ) ২ সের যব রাসূল (ছাঃ)-এর খিদমতে পেশ করে বলেন, সারা রাত পরের ক্ষেতে পানি সেঁচে ৪ সের যব মজুরি হিসাবে পেয়েছি। তার মধ্যে ২ সের বিবি-বাচ্চার জন্য রেখে বাকীটা নিয়ে এসেছি।’ দয়ার নবী তার হাত থেকে যবের থলেটি নিয়ে বললেন, তোমরা এই যবগুলো মূল্যবান মাল-সম্পদের স্ত্তপের উপরে ছড়িয়ে দাও।’ অর্থাৎ এই সামান্য দানের মর্যাদা হল সবার উপরে।

মদীনা প্রত্যাবর্তন ও মদীনাবাসীর অভিনন্দন:

বিজয়ী হয়ে ফেরার পথে দূর হতে মদীনাকে দেখতে পেয়ে খুশীতে রাসূল স. বলে ওঠেন هَذِهِ طَابَةٌ وَهَذَا أُحُدٌ ‘এই যে মদীনা, এই যে ওহোদ’। جَبَلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ ‘এই পাহাড় যে আমাদের ভালবাসে এবং আমরা যাকে ভালবাসি’। মদীনার নারী-শিশু ও বালকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিপুল উৎসাহে রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর গর্বিত সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসে। উল্লেখ্য যে, এটাই ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ। ৫০ দিনের এই সফরে ৩০ দিন যাতায়াতে ও ২০ দিন ছিল তাবুকে অবস্থান। রজব মাসে গমন ও রামাযান মাসে প্রত্যাবর্তন।

মুনাফিকদের প্রতি কঠোর হবার নির্দেশ:

তবুক যুদ্ধের সময় মুনাফিকেরা যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছিল, তা ছিল ক্ষমার অযোগ্য। বিশেষ করে বহিঃশক্তি রোমক বাহিনীকে মদীনা আক্রমণের আহবান জানানো ও তার জন্য ষড়যন্ত্রের আখড়া হিসাবে ক্বোবায় ‘মসজিদে যেরার’ নির্মাণ ছিল রীতিমত রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। এ প্রেক্ষিতে এদের অপতৎপরতা যাতে আর বৃদ্ধি পেতে না পারে এবং রাসূলের উদারতাকে তারা দুর্বলতা না ভাবে, সে কারণে আল্লাহ পাক স্বীয় রাসূলকে তাদের ব্যাপারে কঠোর হবার আদেশ নাযিল করে বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ- ‘হে নবী! কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন ও তাদের প্রতি কঠোর হউন। তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম এবং কতই না মন্দ ঠিকানা সেটি (তওবাহ ৯/৭৩)।’

এখানে মুনাফিকদের সাথে জিহাদের অর্থ হল মৌখিক জিহাদ। কেননা আল্লাহর রাসূল স. কখনোই তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করেননি বা তাদেরকে হত্যা করেননি।

তাবুক যুদ্ধের গুরুত্ব:

(১) এই যুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তি রোমকবাহিনীর যুদ্ধ ছাড়াই পিছু হটে যাওয়ায় মুসলিম শক্তির প্রভাব আরব ও আরব এলাকার বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

(২) রোমকদের কেন্দ্রবিন্দু সিরিয়া ও তার আশপাশের সকল খৃষ্টান শাসক ও গোত্রীয় নেতৃবৃন্দ মুসলিম শক্তির সাথে স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করে। ফলে আরব এলাকা বহিঃশক্তির হামলা থেকে নিরাপদ হয়।

(৩) শুধু অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি হিসাবে নয়, সর্বোচ্চ মানবাধিকার নিশ্চিতকারী বাহিনী হিসাবে মুসলমানদের সুনাম-সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দলে দলে খৃষ্টানরা মুসলমান হয়ে যায় এবং যা খেলাফতে রাশেদাহর সময় বিশ্বব্যাপী মুসলিম বিজয়ে সহায়ক হয়।


২৭ রজব ১৪৪০

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.