একানব্বই’র ক্ষত শুকায়নি আজও!

২৫১ কোটি টাকার কাজ চলছে ধীর গতিতে
অরক্ষিত উপকূলে সাগরের নির্দয় গর্জন

আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল ২৬ বছরেও
থামেনি স্বজন হারাদের কান্না

  • মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ ছানুবী : আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ২৬ বছর পূর্বে ১৯৯১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। রাতের অন্ধকারে মুহূর্তের মধ্যে সেদিন লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল উপকূলীয় এলাকা। নিহত হয় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ। গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার। দেশের মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল প্রকৃতির করুণ এই রুদ্ধশ্বাস। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এতবড় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এদেশের মানুষ আর কখনো হয়নি। সেই দিনের স্বজনহারা মানুষের কান্নায় এখনও ভারি হয় উপকূলের আকাশ বাতাস। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপকূলবাসীসহ সারা বাংলাদেশের মানুষকে সেই ভয়াবহ স্মৃতি স্বজন হারানোর বেদনা আজও অশ্রু ভারাক্রান্ত করে তুলে। ইতিহাসের ওই ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার ১ লাখ ৩০ হাজার বনি আদমসহ লাখ লাখ পশুপাখি, গরু-মহিষ, হাঁস-মুরগীর করুণ মৃত্যু এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হয়ে প্রচুর ধনসম্পদ ভেসে যায়। ঘূর্ণিঝড়ে দেশের সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকা বাঁশখালী। শুধু বাঁশখালীতেই সেদিন ৪৫ হাজার মানুষ নিহত এবং কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সাগর পাড় থেকে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে এমন কোন ঘর এবং পরিবার ছিল না যে ঘর এবং পরিবারের একাধিক মানুষ সেদিন নিহত এবং হারিয়ে যায়নি। সেদিনের ঝড়ো ছোবল ও অথৈ পানিতে বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছিল উপকূলীয় এলাকা। প্রায় ৩৭ কিলোমিটার সাগরবেষ্টিত বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা একটি মাত্র ভেড়িবাঁধের অভাবে আজও অরক্ষিত। অবশ্য বর্তমান সরকার উপকূলবাসীকে রক্ষার্থে ২৫১ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ দিয়ে উপকূলীয় বেড়িবাঁধকে আধুনিক বেড়িবাঁধে পরিণত করার কার্যক্রম হাতে নিলেও ঠিকাদারদের নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে খুবই ধীর গতিতে চলছে উন্নয়ন কাজ। উপকূলীয় জনগণের অভিযোগ বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজে যথেষ্ট অনিয়ম পরিলক্ষিত হলেও স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেন কোন মাথাব্যাথা নেই। অথচ উপকূলবাসীর জীবন-মরণ বাঁধ খ্যাত এ বেড়িবাধটি অরক্ষিত থাকায় বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী ৫ লক্ষাধিক মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। উপকূলীয় ছনুয়া, বড়ঘোনা, গন্ডামারা, সরল, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, ইলশা,পুকুরিয়া,সাধনপুর ও প্রেমাশিয়াসহ বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ প্রতি বর্ষায় আরো একটি ২৯ এপ্রিলের ছোবল আতঙ্কে রীতিমত তটস্থ থাকেন। প্রতিবছর এই দিনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে উপকূলবাসীর মাঝে। বিশেষ করে খানখানাবাদ, কদমরসুল, ছনুয়া, বড়ঘোনা, গন্ডামারা ও প্রেমাশিয়া এলাকায় প্রতি বর্ষায় সামুদ্রিক লবণ পানি প্রবেশ করে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হয়। এই সময় হাজার হাজার মানুষকে পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনাযাপন করতে হয়। ৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপকূলীয় এলাকার অসহায় মানুষগুলোর জীবন রক্ষার্থে আধুনিক ভেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সাগর পাড় এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেন্টার এবং আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের ওয়াদা ও তাগিদ দিয়ে দীর্ঘ ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজো তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও বিদেশী দানশীল ব্যক্তিবর্গ প্রায় ১১৮টি সাইক্লোন সেল্টার বাঁশখালীতে নির্মাণ করলেও তার অধিকাংশই সাধারণ জনগণের উপকারে আসছে না। অধিকাংশ সাইক্লোন সেল্টার বর্তমানে মাদকসেবী, নেশাখোর ও মাস্তানদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। ছনুয়া, খানখানাবাদ, গন্ডামারা ইউপি’র বেশকিছু সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণে ত্রুটি, আকারে ছোট এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী বিধায় স্থানীয় জনগণ উক্ত সাইক্লোন সেন্টার দিয়ে কোন উপকার পাচ্ছে না। তাছাড়া অধিকাংশ সাইক্লোন সেন্টার সমুদ্র উপকূলে নির্মাণ না করে প্রভাবশালীদের চাপে মহাসড়কের কোল ঘেঁষে পাহাড়ী এলাকায় অপ্রয়োজনীয় স্থানে নির্মাণ করার ফলে সেগুলোও জনগণের কোন কাজে আসছে না। প্রধান সড়কের কোল ঘেঁষে নির্মিত সাইক্লোন সেল্টারগুলো এখন স্থানীয় প্রভাবশালী, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ, মাস্তান ও অপরাধীদের নিরাপদ আখড়া। তাছাড়া উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ, ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মাণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনায়াসেই বৃদ্ধি পায়। উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন রক্ষার্থে এখানে একটি ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আধুনিক ভেড়িবাঁধ নির্মাণ, উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেল্টার ও আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন, বর্তমানে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা সাইক্লোন সেল্টার গুলো দখলমুক্ত করণ এবং উপকূলীয় এলাকার রাস্তাঘাটের সংস্কার, ব্রীজ-কালভাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে বাঁশখালী উপকূলীয় জনগণের চাহিদা পূরণে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখনই এগিয়ে আসতে হবে। যা উপকূলবাসীর প্রাণের দাবী।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.