আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ বাঁশখালীর জামাল উদ্দীন চৌধুরী

শহীদ হাবীব

যুগে যুগে বাঁশখালীর মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেক জ্ঞানী গুণী ও মনীষী, যারা ধন্য করেছেন বাঁশখালীর মাটিকে, যারা এই বাঁশখালীকে পরিচিত করেছেন বিশ্বের দরবারে, মাথা উঁচু করেছেন বাঁশখালীর। আজ বাঁশখালীর এমনই এক রত্নের সাথে একান্তে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এল তাঁর সফল জীবনের অজানা অনেক কিছুই। তিনি হলেন বাঁশখালীর পুইছড়ি ইউনিয়নের কৃতী সন্তান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরী স্যার। আজ স্যার এর সাথে দীর্ঘ তিন ঘণ্টার একান্ত আলাপচারিতায় আমি জানার চেষ্টা করি তাঁর সফল জীবনের সাফল্যগাঁথা।।।

আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরী। এক কথায় মানুষ গড়ার এক জীবন্ত কারিগর। তিনি একাধারে শিক্ষক, কলামিস্ট ও সমাজসেবক। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ১ অক্টোবর বাঁশখালীর পুইছড়ি ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত পুুইছড়ি জমিদার বাড়িতে। পিতা মাওলানা আবদুর রহমান চৌধুরী, মাতা ছেমন আরা বেগম চৌধুরাণী। তিনি ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রামের রাউজানের মহিয়সী নারী ফাউজিয়া শেলী চৌধুরীর সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বর্তমানে ফাউজিয়া শেলী চৌধুরী লন্ডনে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। ব্যক্তিগত জীবনে জামাল উদ্দীন চৌধুরী দুই সন্তানের জনক। এরা হলেন- সেজাদ রহমান চৌধুরী অনিক এবং রাগিব রহমান চৌধুরী। বড় ছেলে সেজাদ রহমান চৌধুরী University College London থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং ছোট ছেলে রাগিব রহমান চৌধুরী বিশ্ববিখ্যাত Oxford University তে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত আছেন।

# শিক্ষাজীবনঃ
এই মহান জ্ঞান তাপসের পাঠ্যজীবন শুরু হয় ১৯৫৭ সালে বাঁশখালীর পশ্চিম পুইছড়ি গ্রামের ইজ্জতীয়া প্রাইমারী স্কুলে। তিনি বাঁশখালীর নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাশ করেন। তারপর ১৯৬৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ হতে এইচএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিত বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৭৫ সালে স্নাতক এবং ১৯৭৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর তিনি যুক্তরাজ্যের Greenwich University London হতে ১৯৮৭ সালে কৃতিত্বের সহিত PGCE সম্পন্ন করেন।

# পেশাজীবনঃ
অসম্ভব মেধা ও মননের অধিকারী এ মহান বিদ্বান শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং নিরলসভাবে করেছেন জ্ঞানের চাষাবাদ। পেশাজীবনের শুরুতে তিনি ১৯৭৯ সালে ইরানের Iranian Airforce এ যোগ দেন। সেখানে দুই বছর চাকুরীর পর ১৯৮১ সালে তিনি আলজেরিয়ার Ministry of Education এ যোগদান করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ছয় বছর শিক্ষকতার পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এসময় তিনি আলজেরিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমেদ বেন বেল্লার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পান। তারপর তিনি ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চলে যান। ওখানে গিয়ে তিনি ১৯৮৭ সালে Greenwich University London থেকে এক বছর মেয়াদী PGCE ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। তারপর তিনি ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকারের British Citizenship পান। এরপর তিনি ১৯৮৮ সাল হতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত Saint Paul’s Secondary School and College London, Morpeth Secondary School and College London সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ তিনি Cumberland Sports College London এর গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সপরিবারে লন্ডনের Newbury Park IG2 7DY এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী রোডে তাঁর নিজ বাসভবন রয়েছে।

# লেখালেখিঃ
বিরল প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখিতেও নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সবসময়। তিনি লন্ডনের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘Eastern Standard’ এবং লন্ডনের বাংলা পত্রিকা ‘জনমত’ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। ‘Eastern Standard’ পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘Leadership’ বিষয়ক কলামটি লন্ডনে ব্যাপক সমাদৃত হয়। জামাল উদ্দীন চৌধুরীর লেখালেখির মূল উপজীব্য বিষয় ছিল একমাত্র শিক্ষা।

# সাংগঠনিক সম্পৃক্ততাঃ
তিনি National Union of Teachers London (NUT) এর নির্বাহী সদস্য এবং Bangladeshi Teachers Association London (BTA) এর সিনিয়র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া তিনি লন্ডনের Edexel Examiner হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

# সমাজসেবায় অগ্রণী ভুমিকাঃ
বাঁশখালীর এই উজ্জল নক্ষত্র বাঁশখালী আলাওল ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। তাছাড়া তিনি ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত পুইছড়ি ইজ্জতীয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়কে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়েও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ওনার অবদান প্রশংসনীয়। নির্লোভ নিরহংকারী সাদা মনের এই মানুষটি কখনো সমাজসেবার বিনিময়ে কিছুই চাননি, চাননি কোন যশ বা খ্যাতি। তাই তো তিনি সবসময় নিজেকে দূরে রেখেছেন খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে।

# মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভুমিকাঃ
আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরী যখন তরুণ ছাত্র তখন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলেন। ১৯৭১ সালের মে মাস, তখন তিনি ছিলেন কুমিল্লায়। তখন তিনি তাঁর এক বন্ধুসহ কুমিল্লা থেকে আগরতলা হয়ে সাবরুম দিয়ে মাঝিরঘাট হয়ে চট্টগ্রাম আসতেছিলেন। তখন আগরতলায় মেজর জিয়াউর রহমান আর চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার তৎকালীন দারোগা কাজী সাহেবের সাথে এদের সাক্ষাৎ হয়। সেসময় কাজী সাহেবের পরিবার চট্টগ্রামে পাকবাহিনীর নজরে জিম্মী ছিল। তাই জামাল উদ্দীন চৌধুরীকে পেয়ে মেজর জিয়া আর কাজী সাহেব ওনাকে অনুরোধ জানালেন যেন কাজী সাহেবের পরিবারকে উদ্ধার করে কুমিল্লায় নিজ বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তখন জামাল উদ্দীন চৌধুরী আর ওনার বন্ধু আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম এসে কাজী সাহেবের পরিবারকে উদ্ধার করেন, তারপর আগরতলায় নিয়ে গিয়ে মেজর জিয়া ও কাজী সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়ে পুনরায় কুমিল্লায় গিয়ে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাসহ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এমন সব বিরল অবদান সত্বেও এই মহান মানুষটি নিজেকে রেখেছেন সবার অন্তরালে, কখনোই চাননি মুক্তিযুদ্ধার সনদ, কখনোই ছুটেননি খ্যাতির পেছনে। আসলে ইনি হলেন আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নীরব ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।

# পুরষ্কার বা সম্মাননাঃ
শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরীকে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করেন। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার লন্ডনের Local Professionals দের Queen Marry University তে আমন্ত্রণ জানান এবং ওখানে আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পান এবং অংশগ্রহণ করেন। লন্ডন অলিম্পিক ২০১২ তে অংশগ্রহণ করে সরকারের বিশেষ দায়িত্ব পালন করায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পুরষ্কৃত করেন আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরীকে। এসব ছাড়াও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশে বিদেশে বিভিন্ন পুরষ্কারে ভূষিত হন।

# বিদেশ সফরঃ
আলহাজ্ব জামাল উদ্দীন চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে এক ভ্রমণপিপাসু মানুষ। এ পর্যন্ত তিনি বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে সৌদিআরব, দুবাই, কাতার, ইরাক, ইরান, আলজেরিয়া, তুরস্ক, জর্ডান, বাহরাইন, পাকিস্তান, ভারত, ইতালী, মিশর, গ্রীস, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, জার্মান, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
এই মহান মানুষটি তাঁর সফল জীবনে জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতা ও মনীষীর সাথে সাক্ষাতের বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন।

বাঁশখালীর এই উজ্জল নক্ষত্র আমাদের অহংকার আমাদের গৌরব, এই নক্ষত্রের আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা বিশ্বে।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.