আজ শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলমের (রহঃ) বার্ষিক ওরশ

Prottasha-Coaching
নাফিজ মিনহাজ: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর গ্রামের ইজ্জতনগর এলাকার সাহেব বাড়ীর অধিবাসী শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) প্রকাশ শাহ্ সাহেব ১৮৫৬ সালে মাতামহের বাসভবন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জাফর আলী হিলে (বর্তমানে ডিসি হিল) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খান বাহাদুর আনোয়ার আলী খান ছিলেন তৎকালীন একমাত্র মুসলিম সাব-জজ ও সদরে আমিন। কালীপুর ইউনিয়নের সদর আমিন হাট তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মায়ের নাম জহির উন নিসা।

১৮৭৮ সালে শাহ্ সাহেব স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৮৮৩ সালে নোয়াখালীর খাস মহলে সাব-ডেপুটি হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন। ১৮৮৬ সালে নোয়াখালীর ডেপুটি কালেক্টর নিযুক্ত হন। ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১৮৯১ সালের পর সমগ্র ভারতবর্ষে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে তেজস্বী শাহ সাহেব আন্দোলনের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ইংরেজদের গোলামী না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে ১৩ মার্চ ১৮৯২ সালে চাকুরী হতে ইস্তফা দিয়ে স্বাধিনতার নেশায় সরকারী দপ্তর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন দেশমাতৃকার টানে।

চাকুরী ত্যাগ করে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পীঠস্থান ও বঙ্গদেশের রাজধানী কলিকাতায় গিয়ে নওয়াব সিরাজুল ইসলাম, নওয়াব আব্দুল লতিফ প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলার মুসলমানদের প্রথম ও একমাত্র মুখপাত্র “দি মোহাম্মদান অবজারভার” নামক ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদনার দায়ীত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর সম্পাদকীয়তে দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা, ইংরেজ বিরোধী ও জাতীয়তাবাদী মননশীল বলিষ্ঠ লেখনী ইংরেজদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। শেষপর্যন্ত ইংরেজদের রোষানলে পড়ে ১৯৯৪ সালে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি কলিকাতা থেকে কালীপুরে গ্রামের বাড়ীতে চলে আসেন। গ্রামে ফিরে জীবিকার তাগিদে কৃষিকাজ শুরু করেন। তিনি তার “আমার পীর” বইয়ে লিখেন “বাস্তবিক ১৮৯৫ সনের ফেব্রুয়ারি হইতে ১৮৯৬ সনের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ১ বৎসর মাস কাল আমার কৃষক জীবনই আমার জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সময় বলিয়া আমি স্বীকার করিতে বাধ্য”।

এই সময়ের পর তিনি আধ্যাত্মিক জগতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। গাউছুল আজম হজরত মহিদ্দিন সৈয়দ শেখ আব্দুল কাদের জিলানী ওরফে বড় পীর সাহেব (রহঃ) এর তরিকায় ধর্মমত ও দর্শনের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও আলেম চট্টগ্রাম জেলার মির্জাখিল দরবার শরীফের পীর মখদুমুল আলম শাহ জাহাঁঙ্গীর শেখুরুল আরেফিন হযরত সৈয়দুল মৌলানা মোখলেছুর রহমান (রহঃ) এর সুযোগ্য গদীনশীল সন্তান শাহ জাহাঁঙ্গীর ফকরুল আরেফিন হযরত ছৈয়দুল মৌলানা মোহাম্মদ আবদুল হাই (রহঃ) এর আধ্যাতিক শিষ্যত্ব ও খেলাফত গ্রহন করেন। তিনি ভূষিত হন হযরত মৌলানা শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) ওরফে জোলফক্কার শাহ জাঁহাগিরি প্রকাশ শাহ্ সাহেব। এই সময় ইংরেজ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর উপাধি দানে সন্তুষ্ট করতে চাইলে তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন। জনগনের দেয়া শাহ্ সাহেব খেতাবই মাথা পেতে নেন।

শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম সক্রিয়ভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। খেলাফত আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের প্রশস্ত বারান্দায় প্রায় প্রতিদিন মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও কাজেম আলী মাস্টারসহ জেলার মুসলিম নেতারা সমাবেত হয়ে সরকার বিরোধী বক্তব্য দিতেন। সরকার বিরোধী বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে শাহ্ সাহেব ১৯১৪ সালে স্বগৃহে অন্তরীণ হন। তিনি খেলাফত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কিছু দিন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। অসহযোগ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করার অপরাধে তিনি এক বছর চট্টগ্রাম কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন।

হায়দ্রাবাদের নিজাম ও ভুপালের রাণীর দরবারে শাহ্ সাহেবের অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি তাদের আধ্যাত্মিক পীর ছিলেন। তিনি তাঁদের অর্থানুকূল্যে ১৯০৫ সালে কালীপুর গ্রামে বাঁশখালী থানার প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় “ইজ্জত নগর হাই স্কুল” প্রতিষ্ঠা করেন। এই স্কুলে ইংরেজি ও ধর্মীয় শিক্ষা দু’টোই ছিল বাধ্যতামূলক। স্কুলের জন্য সরকারি সাহায্য তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ধর্মীয় মতাদর্শে স্কুল পরিচালনা করতেন। এতে ব্রিটিশদের স্থানীয় দোসরদের গভীর চক্রান্তে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেয়ে তিনি আঘাত পেলেন এবং মরমাহত হলেন। তিনি লেখনীর মাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি মনুষ্যত্ব, ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ক বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তৎমধ্যে উল্লেখযোগ্য ১) The Universal Religion of Man in the light of Islam and what is man Vol. 1 & 2, ২) ফতুহুল গায়ব, ৩) আদবে মুরীদ, আদবে তরীক্বত, জাহাঙ্গীরি দর্পণ, ৪) আইনীয়ে জাহাঙ্গীরি, ৫) আজকার ও আশগাল, ৬) আমার পীর, ৭) ওয়াহাবী বিভ্রমণ ইত্যাদি।

শাহ্ সাহেব ইসলাম ও মুনুষ্যাত্বের বাণী পৌঁছানোর জন্য সিংহল, বার্মা, ভারতসহ উপমহাদেশের এক প্রাম্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন। এসব জায়গায় তাঁর অসংখ্য মুরিদ, শিষ্য ছিল। এসব মুরিদ বা শিষ্যদের অনেক ওয়ারিশ এখনও তার ওয়ারিশগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকেন। তিনি দুইবার পবিত্র হজব্রত পালন করেন।

শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) ১৯৩১ সালে ১জুন, ১৪ মহরম ১৩৫০ হিজরী প্রত্যুষে ইন্তেকাল করেন। অগ্নিযুগের এ বীর দেশ ও জাতির জন্য চিরন্তন প্রেরণা হয়ে তাঁরই বাড়ির সামনের সুনীল দিঘির উত্তর পাড়ে নয়নাভিরাম স্মৃতিসৌধের অভ্যন্তরে শুয়ে আছেন। তার পর থেকে প্রতি হিজরী সনের ১৪ মহরম তারিখ দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান হতে আগত তাঁর ওয়ারিশ শিষ্য গুণগ্রাহী ও তাদের সন্তানদের উপস্থিতিতে বাঁশখালীর কালীপুর সাহেব বাড়ীর শাহ্ মোহাম্মদ বদিউল আলম (রহঃ) এর মাজার শরীফে বার্ষিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়।

Prottasha-Coaching

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.