BanshkhaliTimes

অসহায় মানুষের পাশে মানবিক তারুণ্য ‘টিম সাজিদ’

BanshkhaliTimes

আবু ওবাইদা আরাফাত: নেতিবাচক খবরের ভীড়ে কিছু খবর আমাদের প্রেরণা জোগায়। নতুন ভোর দেখার স্বপ্ন দেখায়। মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার নেপথ্য কারিগর আমাদের মানবিক তারুণ্য। নিজের স্বার্থকে তুচ্ছ করে একই সাথে নিজ ও পরিবারকে সমূহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেও কেউ কেউ দিব্যি রচনা করে চলেছেন মানবিকতার গল্প। এই মানবিক উপখ্যান বিবেকের তাড়নাপ্রসূত, কেবল মস্তিষ্কের নিউরনে ‘মানবসেবা’র সিগনাল কিলবিল করলেই প্রতিনিয়ত মানুষের দুর্দশায় সাড়া দেয়া সম্ভব।
বলছিলাম টিম সাজিদ প্রসঙ্গে। সাজিদ আব্দুল্লাহ সাইফ নামের এই যুবকের নেতৃত্বে কিছু মানবিক তরুণের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে টিম সাজিদ। তার সাথে কথা বলে জানা গেছে- করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার আগে থেকেই শহরজুড়ে ফ্রি অক্সিজেন সাপোর্ট চালু করেছেন তারা। গত ৪ মাসে প্রায় ৫০০ অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করেছে টিম সাজিদ।’
সাজিদ বলেন- ‘আমরা চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও আনোয়ারা, ভাটিয়ারি, রাউজানে ফ্রি অক্সিজেন সেবা ছড়িয়ে দিয়েছি। এই সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা কারও কাছ থেকে পয়সা নিইনা। ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে আমরা আমাদের সেবা কার্যক্রমের কথা মানুষকে জানিয়ে থাকি। আমাদের কাছে ফোন আসলে গভীর রাতেও মুমূর্ষু সংকটাপন্ন রোগীর সেবায় বের হয়ে পড়ে টিম সাজিদের সদস্যরা।’

BanshkhaliTimes

টিম সাজিদের উদ্যোগে এ পর্যন্ত অসংখ্য রোগীকে পরিবহন করে হাসপাতালে ভর্তি ও অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়েছে।এছাড়াও রোগীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ইউএসটিসি ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালেও অক্সিজেন সিলিন্ডার সাপোর্ট পৌঁছে দেয়া হয়।

টিম সাজিদের সদস্যদের মধ্যে জিয়াউর রহমান, শফিক, কামরুল, শুয়াইব, জিয়াউল করিম, হাসান, জাহিদ, শহিদুল, লিমন অন্যতম।
এদের মধ্যে টিম মেম্বার শফিকের মাতা কভিড আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কভিড রোগীকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে গিয়ে শফিকও কভিড আক্রান্ত হন।
এছাড়াও কিছুদিন আগে এক করোনা রোগীকে চট্টগ্রাম মা-শিশু হাসপাতালে ভর্তি ও অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়ার পর টিম সাজিদের প্রধান সাজিদসহ ৫ জন সদস্য করোনা আক্রান্ত হন।

সাজিদ এই প্রতিবেদককে বলেন- ‘আমাদের চাওয়া এই সমাজের কোন মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে, কেউ যেন অসহায় হয়ে চিকিৎসা না পেয়ে মারা না যায়। আমরা সবাই যেন নিজ নিজ অবস্থান হতে আশপাশের অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসি। এটাই আমার চাওয়া। মানুষ মানুষের জন্য এটা যেন ভুলে না যাই।’

মূলত ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয় সাজিদের মানবিক কার্যক্রমের যাত্রা। সেসময় নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করলে প্রায় ৪০০ রোহিঙ্গাকে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ও ঔষধ সরবরাহ করে। বিভিন্ন মানবিক মানুষের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ৪ মাস ধরে এই সেবা অব্যাহত রাখেন।

সাজিদ চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানার কলাউজান গ্রামের সন্তান। মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) পাশ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

টিম সাজিদ এ পর্যন্ত ১০০ এর বেশি পঙ্গু মানুষকে হুইল চেয়ার বিতরণ করেছেন। করোনা দুর্যোগে চাকুরি হারানো মধ্যবিত্ত পরিবার যারা চক্ষুলজ্জায় মানুষের কাছে হাত পাততে পারেনি তাদের তথ্য সংগ্রহ করে গোপনে ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে তারা। ফেসবুক মেসেঞ্জারে তথ্য আহবান করে অসংখ্য পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও করোনায় আর্থিক দুর্দশায় পড়া অভিভাবকদের শিশুদের কষ্টের কথা ভেবে শিশুখাদ্য বিতরণের উদ্যোগ নেয় টিম সাজিদ। লেক্টোজেন প্রজেক্টের মাধ্যমে শতাধিক পরিবারের মাঝে গোপনে শিশু খাদ্য পৌঁছে দেয় মানবিক তারুণ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘টিম সাজিদ’।

এই মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে সাজিদ বলেন- ‘আমাদের সেবা কার্যক্রমে মুমূর্ষু রোগী যখন বেঁচে যাওয়ার দিশা পান, অভুক্ত যখন পেট ভরে খেয়ে তৃপ্ত হন, কোন পঙ্গু যখন চলাচলের উপায় খুঁজে পায় তখন এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। এই মানুষগুলোর অন্তরভরে দোয়া আমাদের জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলে মনে করি। আমাদের এসব কার্যক্রম আঞ্জাম দেয়ার পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান তারা হলেন- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু বড়মনের মানুষ, আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদানে সম্মানিত করুক।
সাজিদ বলেন-‘আমাদের কিছু নেতিবাচক পরিস্থিতিরও সম্মুখীন হতে হয়েছে। কেউ কেউ সিলিন্ডার ফেরত দিতে গড়িমসি করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুক’।

একটি সহানুভূতিপূর্ণ সমাজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত রচনা করতে দেশের আনাচে কানাচে উদিত হোক সাজিদের মতো অসংখ্য ‘তারকা’।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published.